>> জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩০ ডিসেম্বর : শিক্ষামন্ত্রী >> ইয়েমেনের রাজধানী সানায় আবার সৌদি বিমান হামলা নিহত ৩ >> হবিগঞ্জে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে ২ জন নিহত

ফুলতলার ছোট কাশেম

প্রতাপ কামাল

Darkness sm 1তখনকার দিনের থানা কৃষি কর্মকর্তা বাবা যখন বদলী হয়ে খুলনা ফুলতলা আসলেন, তখন আমি খুব ছোট। স্কুলে যাইনা, ঘরে বসেই ক্লাস ওয়ান এবং টু উভয় ক্লাসের বই পড়ি।

সে সময় থানা পর্যায়ে সরকারী কর্মকর্তা বলতে প্রধানত তিনজন। সার্কেল অফিসার বা সিও, থানা কৃষি কর্মকর্তা বা টিএও (টিও) এবং থানার ওসি। সেই সাথে থানার আরও দুই তিন জন সাব-ইনস্পেক্টর বা দারোগা। ওসিরাও তখন সাব-ইনস্পেক্টর। সে সময় তিন-চার থানা মিলে দু’জন শেয়ার্ড কর্মকর্তা ছিলেন। একজন রেভিনিউ সার্কেল অফিসার বা আরসিও এবং একজন সাবরেজিষ্ট্রার। তবে এরা দু’জনের কেউই তখন ফুলতলায় বসতেন না।

বাসা ভাড়া পাওয়া যেত না, ফলে অফিসারদের ফ্যামিলি নিয়ে থাকা এক ঝক্কির ব্যাপার ছিল। ফুলতলা থানা কৃর্ষি কার্যালয় ছিল দামোদরে যশোর খুলনা মহাসড়কের পশ্চিম পাশে বিমান সেনদের একটি দোতলা বাড়ী। সরকার পুরো বাড়ীটা ভাড়া করলেও অফিসের জন্য নিচের তলার সবটাও লাগতো না। ফলে দোতলায় আমাদের নিবাস ছিল।

সামনে রাস্তার পূর্ব পাশে মুক্তময়ী উচ্চ বিদ্যালয়, একটু দক্ষিণে ষ্টেশন রোড, আরও একটু দক্ষিণে পথের বাজার। উত্তরে আধা মাইল দুরে সরকারী ডাক্তারখানা। আরও মাইল খানেক উত্তরে ফুলতলা বাজার। বাজার থেকে সিকি মাইল দূরে সিকিরহাট খেয়াঘাট।

ফুলতলায় এসে প্রথমেই যেটা শুনলাম সেটা হ’ল, ভয়ানক ডাকাতের উপদ্রব। চারদিকে ডাকাত। এরা যশোর খুলনা রুটে ট্রেনে ডাকাতি করে এবং মাঝে মাঝে অবস্থাপন্ন গৃহস্থের বাড়ীতেও ডাকতি করে। তখনকার দিনে ইউনিয়ন পরিষদকে বলা হ’ত ইউনিয়ন বোর্ড। বোর্ডের প্রধানকে বলা হ’ত প্রেসিডেন্ট (চেয়ারম্যান আরও অনেক পরে)। ফুলতলা ইউনিয়নের তখনকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন হাবিবুল্লাহ। তিনি একদিন আমার সামনেই বাবার অফিসে বসে ডাকাত সম্পর্কে সাবধান করে গেলেন।

পাশের প্রাইমারি স্কুলে (তখনকার দিনে মন্দির স্কুল) সরাসরি ক্লাস টু’তে ভর্তি হ’লাম। আমাদের ক্লাসে একটি ছেলে পড়ত, তার গোঁফ উঠতে শুরু করেছে এবং বিড়ি খেত। একদিন একটি মেয়ে আমার কানে কানে বলল ঐ ছেলেটি ডাকাত। সে তার চাচার সাথে রাতে ডাকাতি করতে যায়। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার। ঐ ছেলেকে খুব সমীহ করে চলতাম।

ইতোমধ্যে এলাকায় দোর্দণ্ড প্রতাপশালী তিনজনের নাম জেনে গেলাম। বড় কাশেম, ছোট কাশেম এবং গোলাম। আরও জানলাম এরা পারে না হেন কাজ নেই। গোলামের চেহারাটা এখন আর ভাল মনে পড়ে না। আমাদের বাসার পাশেই ষ্টেশন রোড যেখানে যশোর রোডে মিলেছে সেখানে চায়ের দোকানে ছিল তাদের আড্ডা। আমরা সব সময় ওদের ভয় পেতাম এবং এড়িয়ে চলতাম। তারপরও ছোট কাশেম মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখা হলে নাম জিজ্ঞেস করত এবং বলত, ‘তুমি টিও সাহেবের ছেলে না?’ কিন্তু আমি কখনোই তার কথার জবাব দিতাম না। স্কুলের পথে হলে হন হন করে হেটে স্কুলে চলে যেতাম এবং বাসার পথে হলে সোজা বাসায় চলে আসতাম।

বাবা ফুলতলা থেকে বদলী হয়ে গেলেও সেখানে আমাদের একটা বন্ধন তৈরী হয়েছিল। ছোটবেলার সেই সব বন্ধুদের সাথে সব সময় একটা যোগাযোগ ছিল। তাছাড়া ফুলতলার পাশে আলকায় বিবাহসূত্রে আমার দুই জ্ঞাতি বোনের বাড়ী ছিল।

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের আগ পর্যন্ত এলাকাটি হিন্দু প্রধান ছিল। অনেক শিক্ষিত সমৃদ্ধ হিন্দুদের বসবাস ছিল সেখানে। তারা যথেষ্ট সম্পদশালী ও বহু ভূ-সম্পত্তির মালিক ছিল। প্রায় প্রত্যেকের বিশাল ফলের বাগান ছিল। আম, জাম, লিচু, পেয়ারা, সফেদা, জামরুল, কাঁঠাল, অশফল (লিচুর মত ছোট, বিচি মোটা, কিন্তু সুস্বাদু),বাতাবী লেবু, আনারস- কী ছিল না সেসব বাগানে। এমন কি পাঁকা দেশী গাাবও ছিল। এসব ফলের বাগান ছিল আমার প্রধান আকর্ষণ। ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠার পর থেকে প্রতি বছর ফলের সিজনে, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে ছুটে যেতাম ফুলতলায়। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর হিন্দুরা ক্রমে ক্রমে ভারতে চলে যেতে শুরু করে। তারপরও মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত নানা কারণে ফুলতলায় নিয়মিত যাতায়াত করতাম। মুক্তিযুদ্ধের পরও যখন একটি জুট মিলে চাকরী নিলাম তখনও ফুলতলায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তখনও দুই কাশেম বেশ আলোচিত।

১৯৭৫ সালে ফুলতলায় গিয়ে আলকায় ঢোকার মুখে একটি দোকানে বসে তিন বন্ধু চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটি মোটর সাইকেলে চেপে ছোট কাশেম সেখানে এসে হাজির। দোকানে ঢুকে আমাকে দেখে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বলল,
-তুমি টিও সাহেবের ছেল না?
যথেষ্ট বড় হয়েছি, কথা না বললে অসৌজন্য হয়, তাই বললাম, হ্যাঁ।
-আমি তোমাকে ঠিকই চিনেছি। বল কী খাবা?
-চা কেবল শেষ করলাম!
-তা হবে না, আমার সাথে কিছু খেতে হবে।
-আমার খিদে নেই।
-ভাত খেতে তো আর বলছি না! দু’টো পুরি খাও।
কাশেম আমাদের তিন বন্ধুর জন্যই দু’টো করে পুরির অর্ডার দিল, সেই সাথে আবার চায়ের অর্ডার। ঐ দোকানের পুরি আসলেই বিখ্যাত ছিল। প্রকৃত ডালপুরি এবং খুবই মোলায়েম।
ডালপুরি খেতে খেতে কাশেম জানতে চাইল,
-তুমি এত ঘন ঘন ফুলতলা আস কেন?
-বন্ধুদের বাড়ীতে বেড়াতে আসি, তাছাড়া পাশেই মিলে চাকরী করি। বেড়ানোর যায়গা তো এটাই প্রথম। রোজ রোজ তো আর খুলনা যাওয়া হয়না।
– তা ঠিক। কিন্তু জানো তো ফুলতলা ভাল জায়গা না। মানুষজনও ভাল না। সাবধানে মেলা মেশা ক’রো।
সাহস করে বলেই ফেললাম,
-আপনাকেও তো লোকে ভাল বলে না। তারপরও আপনার চা-পুরি খাচ্ছি।
কাশেম হাসল, হেসে বলল,
-তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি মুখের উপরেই কথাটা বলে দিলে। কী করব বলো? আমিতো সবার মুখ বন্ধ করে রাখতে পারি না!
-তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু যা রটে……
-জানো, তোমার মত সাহসী বুকের পাটাওয়ালা ছেলেরা ফুলতলায় বেশী দিন টেকে না।
-আপনি বাড়িয়ে বলছেন, আমি সে রকম কিছু না।
-তাহলে বলি শোন, এক সময় ছোট ছোট বাচ্চারা আমাকে দেখলে কেঁদে দিত। বিশেষ করে কিছু জিজ্ঞেস করলে ভয়ে কেঁদে ফেলত। কিন্তু সেই ছোট্ট বেলা তোমাকে কখনও ভয় পেতে দেখিনি। তুমি আমার কথার জবাব না দিয়ে হন হন করে হেঁটে চলে যেতে।
-সেটা আপনার ধারণা।
-আমার ব্যস্ততা আছে, আর বসতে পারব না। আজ আসি আবার দেখা হবে।
কাশেম চা-পুরির দাম মিটিয়ে দিয়ে চলে গেল।

খুলনায় একটা সংস্থায় চাকরী নিয়েছিলাম। খুলনা থেকে মোটরসাইকেলে মেহেরপুর মুজিবনগর, যশোর শিমুলিয়া এবং ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর পার হয়ে ট্যাকের হাট দিয়ে বানিয়ার চরে যেতে হ’ত। লম্বা জার্নি, তাই পথে পথে পরিচিত জায়গায় বসে চা-নাস্তা করাম। যাতায়াতের পথে ফুলতলা ছিল অন্যতম।

১৯৮০ সালে আবার একদিন চায়ের দোকানে কাশেমের সাথে দেখা। বলল,
-নানা গরীবের বাড়ীতে দু’টো ডাল-ভাত খাও।
-অফিসের কাজে বের হয়েছি অনেক দূর যেতে হবে, আজ না।
-তাহলে আর একদিন হবে?
-সে পরে দেখা যাবে।
-আরে নানা, দেখা যাবে মানে কী? ফুলতলা তো আসোই। সোজা চলে আসবা আমার বাড়ীতে, নানীকে বলবা ভাত খাব। ব্যাস।

আমি কাশেমের জনসমক্ষে নানা সম্বোধনে বিব্রতবোধ করছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না এতো অত্মীয়তার হেতু কী। যাহোক, বিদায় নিয়ে মেহেরপুরে রওনা দিলাম।

স্বাধীনতার পর বড় কাশেম আর আগের প্রতাপ ধরে রাখতে পারে নি। দিন দিন মিইয়ে গেছে। কিন্তু ছোট কাশেম ততদিনে সরকারী ডাক্তারখানার সামনে রাস্তার পশ্চিম পাশে পাঁকা বাড়ি করেছে। বাইরে সবুজ রং। বাড়ির পাশে রাস্তর ধার দিয়ে থরে থরে সাজানো ভাটায় পোড়ানো ইট। জেনেছিলাম কাশেমের ২-৩টি ইটের ভাঁটা। নিচু এলাকায় বর্ষার পানিতে ইট ডুবে যায়, ইটের রং নষ্ট হয়ে যায়। তাই ইট এনে যশোর-খুলনা মহাসড়কের পাশে উচু জায়গায় সাঁজিয়ে রাখা।

পরে জেনেছিলাম, ফুলতলা দামোদরে আমার এক বন্ধু এবং কাশেম পরস্পর নানা সম্বোধন করত। সেই সুবাদেই সে আমাকে নানা সম্বোধন করেছিল। তবে বিষয়টি আমাকে বরং বিব্রত করেছিল।

একদিন হঠাৎ শুনলাম নড়াইলের এক স্বনামখ্যাত শিক্ষকের ভাই ডাক্তারী পাশ করে কাশেমের মেয়েকে বিয়ে করেছে। অবাক হয়েছিলাম। শিক্ষকের একটি ভাই আমার বন্ধুস্থানীয় ছিল। তাকে জিজ্ঞাসা করতেই বলল, আমরা নড়ালের মানুষ হলেও আমাদের সদর রাস্তা ফুলতলা। ওখানে কাশেম সাহেব ছাড়া মাথা তোলার মত আর কে আছে! আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটতে কিছুটা সময় লেগেছিল।

কাশেমের সাথে আরও অনেকবার দেখা হয়েছে, বড় জোর এক কাপ চা। এই পর্যন্তই। তার বাড়ীতে ডাল-ভাত খাওয়া কখনও হয়ে উঠেনি। শেষ দেখা ১৯৯৬ সালে। খুলনা গিয়েছিলাম কাজে। যশোরে রাতে থেকে পরদিন ঢাকা আসব। যশোর আসার পথে ফুলতলায় থেমেছিলাম এক বড় ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে। সেই বড় ভাইয়ের বাড়ীতেই কাশেমের সাথে শেষ দেখা। সে তখন দামোদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। কিন্তু কাশেমের জন্য মর্মান্তিক পরিণতি অপেক্ষা করছিল। পরের বছরই ফুলতলা ইউএনও’র অফিসের মধ্যে ঢুকে কারা তাকে গুলি করে হত্যা করে।

তখনও তার পরিবারের জন্য আরও কঠিন আঘাত অপেক্ষা করছিল। কাশেমের মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে বাদল দামোদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়েছিল। তাকেও ২০০৮ সালে আততায়ীরা গুলি করে হত্যা করে। আর মাত্র গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে নিজ বাড়ীর নিচতলায় ছোট ছেলে মিঠুকে আততায়ীরা গুলি করে হত্যা করেছে। এ ছেলেটি একবার ফুলতলা উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিল এবং বর্তমানে খুলনা জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক ছিল।সকল মৃত্যই যেমন দুঃখজনক, এসব মৃত্যুও দুঃখজনক।

তবে কাশেমের দায় তার পরিবারকে আর কতবার চুকাতে হবে, তা কেবল ভবিষ্যৎই বলতে পারে।

বাংলাদেশনিউজ
২৬.০৫.২০১৭


Comments are closed.