>> জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩০ ডিসেম্বর : শিক্ষামন্ত্রী >> ইয়েমেনের রাজধানী সানায় আবার সৌদি বিমান হামলা নিহত ৩ >> হবিগঞ্জে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে ২ জন নিহত

‘শ্যাহে ছুইছে কুহুররে দে সব’

সাইফুল বাতেন টিটো

Saiful Baten Tito smআমার নানা বাড়ির চারপাশে হিন্দু বাড়ি। আমার খালার চেয়ে মাসি বেশী। আর মা মামাদের বন্ধু বান্ধবীদের আমরা ছোট বেলা থেকে এত বড় গলায় মামা মামি মেসো মাসি ডাকতাম যে যারা আমাদের না চিনতো তারা দ্বিধায় পরে যেত। ছোটবেলা থেকেই আমাদের উৎবস ছিলো ঈদ পুজো দুটোই। কালা কির্তোনিয়া মামা, অনিল মামা, বিপুল মামা যে আমাকে কত কোলে করে নিয়ে মাছ ধরেছে তার ইয়াত্তা নেই।

এই সকল পরিবারের অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত যোগ্যতা অন্য আটদশটা পরিবারের মতই মধ্যম মানের ছিলো। মায়ের এক বন্ধবির নাম আমরা খুব শুনতাম। তাঁর নাম না বলি। উনি তখন স্বামি সহ ঢাকায় থাকতেন। মায়ের সাথে অনেকদিন দেখা হয়না…. হয়তো তাঁর বাপের বাড়ি যাওয়ার টাইম আর মায়ের টাইম একত্রিত হয়না। অবশেষে একবার হলো। আমরা নানুবাড়ি গিয়েছি শুনেই ঐ আন্টি লোক পাঠালেন মাকে নেয়ার জন্য। বিকেল বেলা আমি মা বাবা মিলে গেলাম ঐ বাড়িতে। মা আর ঐ আন্টি তো কান্নাকাটিই করলেন কিছু সময়। আব্বুর সাথে দেখলাম আন্টির স্বামীর বেশ জমে গেলো। তারা সন্ধায় কোথায় তাস খেলবে সেই প্লান করতে লাগলো। আমাদের মুড়ি, চিড়া, নাড়ু, কলা, মিষ্টি, দই, ডিম পোস, ডাব ইত্যাদি খেতে দিলো। উল্লেখ্য ঐ সময় কোন বাড়িতে গেলে বাজার থেকে কেনা কোন কিছু খেতে দিতে দেখিনি। অন্তত আমাদের এলাকায় তো দেখিনি। সময়টা নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে।

আমারা খাওয়া দাওয়া করলাম। উঠানে রাখা একটা ময়না বারবার বলছিলো ‘হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ’ কিন্তু আমি বলতে বললে আর বলে না। সন্ধার কিছু আগে আমরা ফিরবো। এমন সময় আমি একটু জল বিয়োগ করতে চাইলাম। বিপিন মামা আমাদের খাওয়ার পরে অবশিষ্ট খাবার, তৈজস পত্র ভিতরে নিতে নিতে আমাকে বলল ‘ভাইগ্না আমার লগে আয়’। আমি বিপিন মামার সাথে তাদের বাহিরের ওপেন কিচেনের পাশে ছালা দিয়ে ঘেরা দুই ইট দিয়ে বানানো ইউরিনালে মনের সুখে জল বিয়োগ করছিলাম। এমন সময় শুনলাম ঘরের মধ্যে কেউ কাউকে বলছে ‘আরে করেকি করেকি? এই মিষ্টি খাইসনা খাইসনা, শ্যাহে ছুইছে, কুহুররে দে সব’।

আমাদের এলাকায় মুসলমানেরা হিন্দুদের বলে নোমো আর মুসলমাদের হিন্দুরা বলে শ্যাখ। মনেহয় শব্দটা আরবীয় শেখ থেকে এসেছে। যাই হোক, আমি চেইন লাগিয়ে দৌড়ে এসে মাকে জিজ্ঞেস করলাম
– মা, কুহুর কি?
মা হাসতে হাসতে বললেন ‘গ্রামের লোকজন অনেকেই কুকুর কে কুহুর বলে, বিশেষ করে হিন্দুরা। তুই যেমন কস কুত্তা’।
আমি ভিষন আঘাত পেলাম।

এই সাম্প্রদায়িকতা হিন্দুদের মধ্যে যেমন আছে তেমন রয়েছে মুসলমানদের মধ্যেও। কিন্তু আশার কথা এখন আর সেই দিন নাই। মনে হয় সেই উঁচু জাতও বিলুপ্ত হবার পথে, যারা নীচু জাতের ছায়া নিজেদের গায়ে লাগলে স্নান করত। এখন আমরা হিন্দু মুসলমান এক প্লেটে খাই। জানি এসব গোঁড়মি কিছুই সনাতন ধর্মের সর্বজন স্বীকৃত ধর্ম গ্রন্থে নেই, বরং সনাতন ধর্মের পরিপন্থি। আবার মুসলমানদের মধ্যেও যে সাম্প্রদায়িকতা দেখা যায় তাও ক্বোরান হাদিসে কোথাও নেই। এসব আসলে একান্তই নিজের সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে কাঠমোল্লা আর ভন্ড পুরুত মিলে করেছে। দুজনের কেউই ধর্ম সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানে না।

কিন্তু দুঃখের বিষয় এই ২০১৭ সালে এসেও আমাদের সমাজ নিয়ন্ত্রন করে ঐ না পড়া সার্থপর মৌ লোভী আর পুরুত মশাইরা। ‘এ নোবি ছালামালাইকা’ না পড়লে আমাদের ঘরে ওঠা হয়না। এরা এখনও শালিশ বিচার করে দোর্রা মারে।

এখনও আমরা এদের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। আর বোধহয় সম্ভাবনাও নেই এই কারনে যে, ঐ সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প ছড়ানো মৌ লোভী আর পুরুত মশাইদের আমাদের রাজনৈতিক সুবিধা হসিলের জন্য খুব দরকার। তাতে মানবতা গোল্লায় যাক!

ঢাকা
১৭ মে, ২০১৭

-প্রথম প্রকাশ ফেসবুকে/ এখানে পুনঃপ্রকাশ

বাংলাদেশনিউজ
২৬.০৫.২০১৭


Comments are closed.