>> জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩০ ডিসেম্বর : শিক্ষামন্ত্রী >> ইয়েমেনের রাজধানী সানায় আবার সৌদি বিমান হামলা নিহত ৩ >> হবিগঞ্জে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে ২ জন নিহত

দরকার পড়লে ঘরের সবাই মোছলমান হইয়া যামু

সাইফুল বাতেন টিটো

Saiful Baten Tito sm‘দরকার পড়ড়লে ঘরের সবাই মিলা মোছলমান হইয়া যামু ভাই, তারপরও নিজের দ্যাশ ছাইড়া ইন্ডিয়া যাইতে চাইনা’।

আমার ছাত্র জীবনে যে শিক্ষকের কাছে বেশী অপদস্থ হয়েছি তাঁর নাম আব্দুল লতীফ ফরায়েজী। উনি আমাদের বাংলা আর ইসলামিয়াত পড়াতেন। তবে বাংলা ক্লাসেও উনি ইসলামী কথা বলে ইসলামের নানা বীরত্বপূর্ণ গল্প করে সময় পার করতে অধিক পছন্দ করতেন। উনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর লেখা একদম পছন্দ করতেন না। ওনার কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বে-দ্বীন। আমাদের ক্লাসে রিপন নামে একটা ছেলে ছিলো, আমাদের সবার চেয়ে বয়সে বড়। লেখাপড়ায় একটু দূর্বল থাকলেও ধর্মকর্মে আর গায়পায়ে আমাদের চাইতে ও বেশ এগিয়ে ছিলো। ওর গলায় সবসময় কাঠের মালা ঝুলত আর কথায় কথায় ‘রাম রাম’ বলত।

আমাদের সাফা স্কুলের সকল ছাত্রছাত্রীকে বৃষ্টির দিনে কাদা ভেঙে স্কুলে আসতে হতো বলে বৃষ্টির সময়ে কেউ আর ইউনিফর্মের ধার ধারত না। কেউ কেউ লুঙ্গি পরেও ক্লাস করত। সাফার পাশের গ্রাম তেঁতুল বাড়িয়ার ছেলে ছিলো রিপন বাড়ৈ। একদিন বৃষ্টিতে ভিজে কাদায় বোধকরি তার সকল ধর্ম নিরপেক্ষ পোষাক ভিজে যাওয়ায় রিপন একখানা ধুতি পরে ক্লাস করছিলো। আমরা সেটা নিয়ে সাধ্যমতো রসিকতা শেষে যখন বাংলা ক্লাসে মননিবেশ করার চেষ্টা করছি, তখনই গোল বাধল। বখতিয়ার খলজি-ভক্ত লতীফ ফরায়েজীর মতে রিপনের ধুতি পরে ক্লাস করার কোন অধিকার নেই। উনি রিপনকে ক্লাস থেকে বের করে দিয়ে, চার খলিফার গুনগান সম্বলিত বয়ান শুরু করলেন। আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম রিপন তার নচ্ছার ধুতির খুট দিয়ে তালাক প্রাপ্তা নারীর মতো চোখ মুছছে। কেন জানিনা আমার চোখ ফেটে জল আসল। আমার মনে হলো পাজামা-পাঞ্জাবি পরা অব্দুল লতীফ ফরায়েজী রিপনের সাথে চরম অন্যায় করছে।

আব্বুর সাথে আমার ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে গল্পালাপ হতো ছোটবেলা থেকেই। আব্বু আমাকে বলেছেন, ধুতি কোন ভাবেই হিন্দুদের আলাদা ধর্মীয় পোশাক না। আব্বুর দাদা নানা নাকি ধুতি পরতেন। আমার দাদাও নাকি ধুতি পরতেন। আব্বু বলেন, ‘আরে লুঙ্গি আমাগো বাঙ্গালীর পোশাক না, লুঙ্গী হইলো মগেগো পোশাক। আমাগো পোশাক হইলো ধুতি।’ আমি ক্লাস শেষে বিষয়টি নিয়ে আব্বুর সাথে কথা বললাম। সারা জীবন টুপি পাঞ্জাবি পরে কাটানো প্রচন্ড ধর্ম নিরপেক্ষ বাবাকে বিষয়টি নাড়া দিলো। তিনি ঐ স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক হওয়ায়, প্রশাসনিক যায়গা থেকে হয়তো লতীফ ফরায়েজীকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করেছিলেন। তারপর থেকে মিতা (দুইজনের একই নাম) হওয়া সত্বেও আব্বুর সাথে আর ঐ স্যারের কোন ভালো সম্পর্ক ছিলো না। আমি যতদিন ঐ স্কুলে ছিলাম, বাংলা আর ইসলামিয়াতে আমার ভালো নম্বর আর জোটেনি।

রিপন এরপর সম্ভবত স্কুল ছেড়ে দিয়েছিলো। বেশ কয়েকবছর পর শুনলাম রিপন নাকি ‘দ্বীনের’ পথে এসেছে। অর্থাৎ রিপন মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেছে। রিপনের সাথে তারপর আর কখনও দেখা হয়নি। তবে রিপন ও আমার কমন এক ফ্রেন্ডের সাথে আজ থেকে পনের বছর আগে দেখা হলে, রিপনের কথা জানতে চেয়েছিলাম। জানালো, সেও রিপনের খবর জানে না, তবে ধর্মান্তরের খবর সেও শুনেছে। কিন্তু কারণ জানে না।

আজ এতদিন পর কেন এই কথা বলছি? কারণ আছে। আমি গতকাল শাহবাগ গিয়েছিলাম। সেখানে শুনলাম একজন ফোনে বলছেন, ‘দরকার পরলে ঘরের সবাই মিলা মোছলমান হইয়া যামু ভাই, তারপরও নিজের দ্যাশ ছাইড়া ইন্ডিয়া যাইতে চাইনা’। কাকে কি উদ্দেশ্যে উনি এ কথা বলছিলেন, আমি জানিনা, কিন্তু মনে হলো দেশটা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গিয়েছে।

ঢাকা
১৭ মে, ২০১৭


Comments are closed.