>> ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন বিমান হামলায় নিহত আরও ৬১

আমেরিকা-তুরস্ক বাকযুদ্ধ দায়েশ পৃষ্ঠপোষকদের ভাঙনের আলামত

সম্পাদকীয়ডেস্ক, বাংলাদেশনিউজ

turkey-daesh-us-450তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি পাকিস্তান সফরে গিয়ে সেদেশের সংসদে দেয়া ভাষণে দায়েশ সন্ত্রাসীদেরকে দেয়া পাশ্চাত্যের অস্ত্র উদ্ধারের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, মার্কিন নেতৃত্বে পাশ্চাত্য বিশ্ব দায়েশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে। এরদোগান কিছু তথ্য প্রমাণ তুলে ধরেন যাতে দেখা যায়, মার্কিন নেতৃত্বে পাশ্চাত্য জোটের অব্যাহত সাহায্য সমর্থনের কারণে দায়েশসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামের জন্য কলঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, পাশ্চাত্য এভাবে ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করছে।

মঙ্গলবারও এরদোগান ইস্তান্বুলে একটি সংবাদ সম্মেলনে একই অভিযোগ করেছেন এবং দাবী করেছেন পাশ্চাত্যের এসব কর্মাণ্ডের ভিডিওসহ অনেক প্রমাণ তাঁর হাতে আছে।

এদিকে, পূর্ব আলেপ্পোয় সিরিয় সেনাবাহিনী সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি থেকে বিপুল পরিমাণ পশ্চিমা অস্ত্র এবং গোলাবারূদ উদ্ধার করেছে। অস্ত্র এবং গোলাবারূদের আশি ভাগেরো্ বেশী আমেরিকা ও জার্মাানীতে তৈরী।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলো দায়েশ সন্ত্রাসীদের সমর্থন দিচ্ছে বলে তুর্কি প্রেসিডেন্টের এসব অভিযোগকে হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মার্ক টোনার। ওয়াশিংটন সিরিয়ায় তৎপর সন্ত্রাসীদেরকে বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সেটাও অস্বীকার করেছেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান দায়েশ সন্ত্রাসীদের হাতে পাশ্চাত্যের তৈরি অস্ত্র সরবরাহের কথা উল্লেখ করলেও, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মার্ক টোনার আলেপ্পোয় সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের ভাণ্ডার আবিষ্কারের বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন। উদ্ধারকৃত আমেরিকা ও জার্মাানীতে তৈরী এসব অস্ত্র তুরস্কের ইনসারলিক বিমান ঘাঁটি হয়ে সীমান্ত পথে সিরিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ গঠন এবং বিদেশেও আন্তর্জাতিক জোট গড়ে ওঠার মাত্র পাঁচ বছরের কম সময়ের মধ্যে তাদের ভেতর যে এভাবে ভাঙ্গন ধরবে ও একে অপরের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়বে তা খুব মানুষই ধারণা করতে পেরেছিলেন। এখন আসাদ বিরোধী দেশগুলো একে অপরকে সন্ত্রাসীদের সমর্থক বলে অভিযোগ করছে। কিন্তু এ কথা এখন ওপেন সিক্রোট যে মধ্যপ্রাচ্যে নিজ নিজ প্রভাব ও স্বার্থ বিস্তারের জন্য পাশ্চাত্য ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ দায়েশ সন্ত্রাসীদের সংগঠিত করেছে।

বিদেশি মদদপুষ্ট ভয়ঙ্কর এ সন্ত্রাসী গ্রুপ শুধু ইরাক নয় একই সঙ্গে সিরিয়ারও বিশাল ভূখণ্ড খুব অল্প সময়ের মধ্যে দখল করে নিয়েছিল। ইরাক ও সিরিয়ায় তৎপর সন্ত্রাসীদের মদদদাতা দেশগুলোর প্রধান হাতিয়ার ছিল আবু বকর আল বাগদাদি যে কিনা দীর্ঘদিন ধরে আলকায়দার সঙ্গে জড়িত ছিল। কুখ্যাত এই সন্ত্রাসীকেই কথাকথিত ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়ে প্রথমে ইরাকে পাঠিয়েছিল পাশ্চাত্য ও কয়েকটি আরব দেশ। এরপর সিরিয়ায় সংকট শুরুর এক বছর পর আল বাগদাদি ইরাক ও সিরিয়ার ব্যাপারে বিদেশী ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য সিরিয়ায়ও অনুগত সন্ত্রাসীদের পাঠানো শুরু করে। আফগানিস্তান ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে আল কায়দা গোষ্ঠী নৃশংস কর্মকাণ্ড চালানোয় এবং গ্রহণযোগ্য কোন সরকারের মডেল দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর তারা দায়েশের নাম ধারণ করে গত পাঁচ বছর ধরে ইরাক ও সিরিয়ায় তৎপরতা চালিয়েছে। কিন্তু এ দেশ দু’টির সরকার ও জনগণের তীব্র প্রতিরোধের মুখে সন্ত্রাসীরা সফল হতে পারেনি। এখন তারা পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে।

দায়েশ গঠনের সময় থেকেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনের মধ্যে, বিশেষ করে পাশ্চাত্য, তুরস্ক ও সৌদি আরবের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের মধ্যে ভিন্নতা ছিল। কারণ, আমেরিকা কুর্দি রাষ্ট্র পুতিষ্ঠা করতে চায়, তুরস্ক জানপ্রাণ দিয়ে কুর্দি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঠেকাতে চায়; অপরদিকে সৌদি আরব ইরাক ও সিরিয়া ভেঙ্গে একটি নতুন সুন্নী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সুন্নী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকানো যাবে, এই আশায় সৌদি পরিকল্পনায় তুরস্কের সায় ছিল। কিন্তু, সিরিয়ায় আলেপ্পো পতনের মাধ্যমে দায়েশ বড়রকমের পরাজয়ের মুখে পড়ায় তাদের পৃষ্ঠপোষক দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ ও উদ্দেশ্যের আলোকে নিজ নিজ অবস্থান ও কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে। আর এটা করতে গিয়ে তাদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে উঠছে। একদিকে তাদের কথিত কোয়ালিশনে অনৈক্য প্রকট হওয়ার পাশাপাশি ভাঙ্গনের আলামতও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রকৃত অর্থে বলতে হয়, তুরস্ক ইতোমধ্যে তাদের কোয়ালিশন থেকে বেরিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশনিউজ
২৮.১২.২০১৬


Comments are closed.