>> ক্রাইষ্টচার্চে শেষ টেষ্টে মুশফিকুর রহিম ও ইমরুল কায়েস খেলতে পারছেন না >> সন্ত্রাসীদের টানেল বোমা হামলায় সিরিয়ার জেনারেল এবং ৮ সেনা নিহত >> রাজধানী ঢাকার নিজাম উদ্দিন রোডে ট্রাকের ধাক্কায় দুই যুবক নিহত >> মাদারীপুরে বাসা চাপায় একজন বৃদ্ধ নিহত

মণি সিংহ মূল্যায়িত না হলে ক্ষতি কার?

চারণ রনি

Moni Singh 22কি পেয়েছেন মণি? এই প্রশ্নবানে, লজ্জিত আমি এক সুসং বাসিন্দা। সুদুরের স্বপ্নে বিভোর চঞ্চল মন ভালোবাসায়-ভালোবেসে বুকভরা প্রত্যাশায় কমরেড মণি সিংহ কে নিয়ে লিখতে বসা, মনে বারবার কড়া নাড়ছে কবীর সুমন এর গান, ”যদিও আকাশ ধোঁয়াসায় ম্রীয়মান-তোমার জন্য লিখছি প্রেমের গান”।

বর্তমান বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৮ জুলাই ২০০০ সালে এই বিপ্লবীর জন্মশতবার্ষীকিতে এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, মনি সিংহের ত্যাগ, আদর্শ, সততা, নিষ্ঠা ও অনুকণীয় দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে পুনরুজ্জীবিত হউক, তিনি হয়ে উঠুক তরুণ বিপ্লবীদের আদর্শ ও অনুপ্রেরণার উৎস।

পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী,সিপিআইএম নেতা জ্যোতি বসু, মণি সিংহ স্মারকগ্রন্থে লিখেছিলেন, “শুধু বাংলাদেশ বলেই নয়, এই গোটা উপমহাদেশে খেটে-খাওয়া মানুষের জীবন-যন্ত্রণার উপশম হয়নি-বরং তা আরো বেড়েছে। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের এখনো অনেক পথ চলা বাকি। মণি সিংহ’দের মত নেতাদের অবদানকে স্মরণ করা জরুরী। কত অসুবিধার মধ্যে কত অত্যাচারের মুখোমুখি হয়ে যে তাদের কাজ করতে হয়েছে তা আজকের প্রজন্মের অনেকের পক্ষে হয়তো আন্দাজ করাই সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যদি তাদের কাছে মণি সিংহ’দের কথা তুলে ধরতে পারি, তবেই তারা লড়াই করার নতুন প্রেরণা পাবেন। ”

কে ছিলেন মণি, কি ছিলেন মণি, কি দিয়েছেন মণি, কি পেয়েছেন মণি?

সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে আপন গতিতে।এই পথচলা অব্যাহত থাক অভিষ্ট লক্ষ্য পূরণে আরোও দ্বিগুণ গতি সঞ্চারী। ১৭৫৭ সালে’র ২৩ জুন পলাশী প্রান্তরে সিরাজের করুন পরিনতি’তে বাংলা’র যে স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো একদা, সেই অস্তগামী সূর্য এই ভাগ্যাকাশে উদিত হতে সময় নিয়েছিলো প্রায় ২১৫ বছর। তমশাছন্ন থেকে আলোকচ্ছটা’র যাত্রা’য় আত্মহুতি হয়েছে অগণীত দেশপ্রেমিকের। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য’র, পাকিস্তান শাসকের শাসন-শোষনের বিরুদ্ধাচারণ করে জেল-জুলুম-জরিমানা ও আত্মবলীদান দিতেও কুন্ঠিত হয়নি অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ’র সন্তানগণ ।সেই সব লড়াই-সংগ্রামে যে সূর্য্য-সন্তানদের মাথা উঁচু করে জানান দিয়েছিলো প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, বিদ্রোহী হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও পাকিস্তান সরকারকে করেছিলো নতজানু, সেই সময়-কালের দুরুন্ত এক লড়াকু শ্রেণি-সংগ্রামী মনি সিংহ।

আ-মৃত্যু যিনি ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার, খেটে-খাওয়া কৃষক- শ্রমিক- মেহনতি মানুষের জন্য অবিসংবিদিত নেতা, আন্দোলনে কিশোর বয়সে’ই ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদের লক্ষ্যে, সশস্ত্র বিপ্লববাদী দল অনুশীলনের হাত ধরে যার বিপ্লবী জীবনের যাত্রা শুরু। মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের রাজনীতি, দর্শন ও আদর্শ যার অনুপ্রেরণা, দেশের স্বাধীনতা অর্জন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আ-মৃত্যু যিনি লড়েছেন, কৃষক- শ্রমিক- মেহনতি মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সমাজ প্রতিষ্ঠাকল্পে, আপোষহীন আন্দোলনে যাঁর অসামান্য অবদান অবিস্মরণীয়, ত্যাগের মহিমায় যিনি সমুজ্জ্বল, তিনি জন-মানুষের মুক্তির কান্ডারী কমরেড মনি সিংহ।

১৯০১ সালের ২৮ জুলাই, পূর্বধলার জমিদারের সন্তান কালীকুমার সিংহ ও সুসং রাজবংশের কন্যা শ্রীমতি সরলা দেবী’র কোল আলোকিত করে পশ্চিম বঙ্গের কলকাতা শহরে জন্ম নেন কমরেড মনি সিংহ।

জন্মের দুই-তিন বছরের মাথায় পিতৃহারা হয়ে আর্থিক সংকটে পড়ে কলকাতা থেকে পাড়ি জমান ঢাকা মামার বাড়িতে। সেখান থেকে নেত্রকোনা মহকুমা’র সুসং দুর্গাপুর মাতুল রাজ্যে। মা এর স্বল্প অংশীদারিত্বে’র দরুন বাড়ি-ভিটে, ফসলি জমি, মাসোহারা’য় সংসারের চাকায় গতিসঞ্চার ঘটে। ফলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন সুসং রাজ্যে।

প্রাথমিক শিক্ষার হাতে খড়ি হয় সুসং থেকে। তারপর কলকাতা। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন ‘অনুশীলন’র’ চেতনায় বিশ্বাসী মন, লড়াকু হাজং’দের সংগঠিত করার নিমিত্তে সুসং থেকে মাইল দশ ক্রোশ দূরের গ্রাম কালিকাবাড়ি/পুর থেকে যাত্রা শুরু করেন বন্ধু, সহচর উপেন সান্যাল কে নিয়ে। উঁচু-নিচু, জাত-পাতের ব্যাবধান হটিয়ে শিক্ষাকে অস্ত্র হিসাবে বেছে নিয়ে স্থাপন করেন বিদ্যালয়। কুসংস্কারের বিরোধিতা করে গ্রামে ক্রমশ হয়ে উঠেন জনপ্রিয়।

অনুশীলন দলের উচ্চ মার্গীয় নেতা সুরেশ চন্দ্র দে’র পত্র নিয়ে কালিকাবাড়ী/পুর গ্রামে আসেন রুশ বিপ্লবী গোপেন চক্রবর্তী। গড়ে উঠে সখ্যতা। নভেম্বর বিপ্লবী গোপেন চক্রবর্তী’র যুক্তি-অনুপ্রেরণায় পরিচিত হন মার্কসী’য় মতবাদের সঙ্গে। মার্কস-লেলিনবাদে উজ্জীবিত মণি শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করত ছুটে আসেন কলকাতা। ক্লাইভ স্ট্রিটের গুপ্ত ম্যানসনে ঘর ভাড়া নিয়ে ‘ওরিয়েন্টাল ট্রেডিং’ নাম দিয়ে একটি অফিস খুলেন। সখ্যতা গড়ে উঠে কমিউনিজম মতবাদী নেতা কমরেড মোজাফফর আহমেদসহ নানান বিপ্লবীদের সাথে। সেখান থেকে মিশন মেটোয়াব্রুজ, লালঝান্ডা’র উত্থান ও সফলতা।

সন ১৯৩০, চট্টগ্রামে মাস্টার দা সূর্য্যসেন এর নেতৃত্বে অস্ত্র লুটে ভীত ইংরেজ প্রশাসন তাদের বিরোধী মতবাদকে দমনে হয়ে ওঠে মরিয়া, এরই ধারাবাহিকতায় কলকাতা থেকে গ্রেফতার করা হয় কমরেড মনি’কে। ৫ বছর কাটে উপমহাদেশের বিভিন্ন জেলে। ১৯৩৫ সালে নিজ গ্রাম সুসং এ অন্তরীণ অবস্থায় ও নিয়মিত হাজিরাদানের শর্তে জেল থেকে ছাড়া পান এই বিপ্লবী।

সন ১৯৩৭, মায়ে’র সঙ্গে দেখা করতে আসা মনি সিংহ নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় পড়েন শোষিতের অশ্রুবানের মুখমুখি। খোদ নিজ পরিবাররের সামন্তপ্রভুদের অত্যাচারের রোমহর্ষকতা পিড়ীত করে কমরেড মনি সিংহকে। টঙ্ক প্রথার নামে কৃষক’দের যে জোর করে তার ফসলের ন্যায্য অংশ থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে, তিনি উপলব্ধি করেন এই চরম বাস্তবতা। যদিও প্রথমে নানাবিধ দ্বিধা-দ্বন্দে ভোগেন। কিন্তু পরবর্তী’তে মার্কসীয় শিক্ষার আলোকে নিজেকে চালিত করে ঔ সব ভুখা-নাঙ্গাদের মুক্তির মিছিলের নেতৃত্বে আসেন। গড়ে তোলেন দুর্বার আন্দোলন। নিজ পারিবারের এই বিদ্রোহীর ভয়ে, ভীত-স্বন্ত্রস্ত সামন্তপ্রভুগণ তাদের প্রভু ইংরেজদের সহায়তায় আবারো জেলে পাঠিয় টংক নেতাকে। কিন্তু দমিয়ে রাখা যায়নি হাজংদের প্রিয় নেতা মণি বেটা কে ।

১৯৪০ এ ময়মনসিংহ জেলা কমিউনিস্ট এর সেক্রেটারী, ১৯৪৫ এ নেত্রকোনা’র নাগড়াতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলনে অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান, ১৯৪৬ এ ভারতের সাধারণ নির্বাচনে ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে পার্টি’র হয়ে নির্বাচন করেন। ১৯৪৬-৪৭ তেভাগা আন্দোলনে রাখেন অসামান্য অবদান, দেশভাগের পর আইয়ুব সরকারের হুলিয়া মাথায় নিয়েও মা-মাটির টানে রয়ে যান পূর্ব-পাকিস্তানে। পাকিস্তান সরকার মই চালায় তাঁর ভিটেয় এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দেয়। ১৯৪৮ এ পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হলে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ এ পুনরায় জঙ্গী রুপে নামেন টঙ্ক প্রথা রহিতে।

সন ১৯৫০, ভীত পাকিস্তান সরকার তীব্র আন্দোলনের মুখে বিলুপ্ত করে টংক প্রথা, চালু করে টাকায় খাজনা, কৃষকের জমিতে স্বত্ব প্রতিষ্ঠা পায়। টংক আন্দোলনের বিভিন্ন সময় হাজংমাতা রাশমণিসহ ৬০ জন নারী-পুরুষ-শিশু বলিদান হন।

পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ পার্টি কমিউনিস্ট ও এর নেতা কমরেড মনি সিংহ কে ধরিয়ে দিতে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। কার্যতঃ হুলিয়া মাথায় নিয়ে ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত আত্মগোপনে থেকেও অব্যাহত রেখেছেন লড়াই-সংগ্রাম। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে, ৫৪ এর প্রাদেশিক নির্বাচনে, ৫৬ তে রাস্ট্র ভাষা বাংলার স্বীকৃ্তি আদায়ে, ১৯৬১ এর শিক্ষা আন্দোলনে রাখেন ভূমিকা।

সন ১৯৬১,মাস পড়ন্ত নভেম্বর,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব,কমরেড মনি সিংহ,কমরেড খোকা রায়, ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, সংবাদ সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধরি মিলিত হন ঢাকা’র মগবাজারের এক বাসায়। আলোচনা করেন দেশের রাজিনৈতিক বিষয়ে করণীয় নিয়ে। নানা মত-পথে সংঘর্ষ ঘটার পরে একাধিক বৈঠকে ঐক্যমতে পৌঁছান নায়ক-মহানায়কগণ। বিকশিত হয় পুস্প, শুরু হয় সংঘবদ্ধ আন্দোলন ছাত্র-জনতা’র। এই মিটিং-কে বঙ্গের বোদ্ধা’গণ পরবর্তী’তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সেতু বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সন ১৯৬৭,গ্রেফতার হন আত্মগোপনে থাকা মণি বেটা,১৯৬৯ এর ২২ ফেব্রুয়ারী ছাত্র-জনতার দাবির প্রেক্ষীতে সকল বন্দি নেতাদের সঙ্গে মুক্ত হন।কিন্তু অল্প কিছুদিনের মাথায় ৬৯ এর জুলাই মাসে আবার গ্রেফতার হন এই বিপ্লবী।

সন ১৯৭১,সমগ্র বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে নামেন স্বাধীনতা যুদ্ধে,মণি বেটা রাজশাহীর জেলে বন্দী, এপ্রিল মাসে অন্যান্য বন্দীগণ কারাগার ভেঙ্গে মুক্ত করে কমরেড মণিসিংহ কে ভারতে পাঠায়, নির্বাচিত হন মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা হিসাবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে রাখেন অসামান্য ভূমিকা। বিশেষত রুশ সরকার ও ভারত সরকারের সমর্থন আদায়ে। যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ গঠণে রাখেন অবদান। এই সালেই মেটিয়াব্রুজের আন্দোলনের নায়ক কমরেড মণি সিংহ কে বাংলার প্রথম রেড ফ্লাগ এর প্রতিস্টাতা হিসাবে কলকাতায় শ্রমিক-গণ সংবর্ধনায় সম্মানিত করা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয়ভাজন মণি দা, ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু কে আমন্ত্রণ জানান বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি’র দ্বীতিয় কাউন্সিলে। প্রিয় মণি দা’র আমন্ত্রনে সাড়া দিয়ে বঙ্গবন্ধু উপস্থিত হন কাউন্সিলে। সেই কাউন্সিলে নির্বাচিত হন সভাপতি হিসাবে। পরবর্তী তৃতীয় কাউন্সিলে ১৯৮০ সালে পুনরায় নির্বাচিত হন সভাপতি হিসাবে এবং ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত পদে স্থায়ী ছিলেন নিজ দলের প্রিয়ভাজন-আস্থাভাজন “বড়ভাই”।

সন ১৯৭৫, বঙ্গবন্ধু সুদুর প্রসারী চিন্তার প্রতিফলনে এক জাতীর ঐক্য সমুন্নত রাখতে এবং উন্নয়নশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশ কৃষক- শ্রমিক- আওয়ামীলীগ গঠন করেন। সেই দলেও মতানৈক্য শেষে সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নে বঙ্গবন্ধুর পাশে ছিলেন কমরেড মণি সিংহ। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে স্বপ্ন ভাঙ্গে তবুও হাল ছাড়েন নি বঙ্গবন্ধুর মণি দা। প্রতিবাদ করেন বঙ্গবন্ধু হত্যার। ১৯৮০ সালে জিয়া সরকার গ্রেফতার করে এই মহান বিপ্লবীকে,কমরেড ফরহাদ সহ।

পরবর্তী’তে পার্টি’র দূর্বার আন্দোলনে মুক্ত হন “বড়ভাই”। চাঙ্গা করে তোলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, কিন্তু বিধির বিধানে গুরুতর অসুস্থ হয়ে ১৯৮৪ সালে’র ২৩ ফেব্রুয়ারী শয্যাশায়ী হন, মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত ছিলেন পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী।

সন ১৯৯০,ডিসেম্বর মাসের ৩১ তারিখ সকাল ১০ টা ৫০ মিনিটে ঢাকা’য় নশ্বরদেহ ত্যাগে ঠাঁয় নেন অনন্ত-অসীমে পার্টি’র বড়ভাই, হাজংদের বেটা, বঙ্গে লাল ঝান্ডার স্থাপক, কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী মানুষের মুক্তি আন্দোলনের মহানায়ক, মুক্তিযুদ্ধের সফল সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর মণি দা।। সৈয়দ শামসুল হক, শেষ শয্যায় শায়িত কমরেড মনি সিংহ কে দেখে, কবিতার শেষ চরণে লিখেছিলেন-

“প্রতিশ্রুত বন্দর সমুখে; আমাদের প্রতিটি নৌকার গলুইয়ে আঁকা থাকবে আপনারই চোখ চিরদিন”।

বিভিন্ন সময়ে দেশ-জাতির কল্যানে অবদানের স্বীকৃ্তি স্বরুপ বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ সালে মরোণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে এই প্রবাদপ্রতীম পুরুষকে।

মৃত্যুর পর স্মৃতি-রক্ষার্থে পার্টি ও তাঁর সন্তান ডাঃ দিবালোক সিংহ সুসং দুর্গাপুরে “মনি সিংহ স্মৃতিস্তম্ভ” স্থাপন করেন। সেখানে প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর থেকে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে আয়োজিত হয় “মণি মেলা”।

পরিতাপের বিষয় হলো এই মাটিতেই রক্তাক্ত হতে হয়েছে মণি সিংহের সন্তানকে, মেলা প্রাঙ্গনে হামলা হয়েছে বার বার মেলার স্থান নিয়ে। যদিও মেলার স্থান ও এর আশ-পাশ একদা মণি সিংহের নিজের সম্পত্তি ছিলো যা পাকিস্তান সরকার হুলিয়া জারী করে নিলাম করে, স্বাধীনতা পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর প্রিয় মণি দা কে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলো তাঁর ভূ-সম্পত্তি, কিন্তু বাধ সাধে খোদ সর্বহারা মানুষের নেতা কমরেড মণি সিংহ।

তিনি বলেছিলেন, এখানে এখন অনেক পরিবার বাস করে তাদের উচ্ছেদ স্বম্ভব নয়, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন সকল কে আমি স্থানান্তর করে আপনাকে আপনার ভিটা ফিরিয়ে দিবো দাদা, মণি সিংহ বলেছিলেন আমি টঙ্ক আন্দোলনের নেতা, এই আন্দোলনে যেসব হাজংসহ মানুষেরা তাদের ভিটে-মাটি হারিয়েছে তাদের কে কি সম্পত্তি ফিরত দিতে পারবেন? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আসাম থেকে আসা রিফুজীরা ঔ সব জমিতে এখন আইন সম্মতভাবে বসবাস করছে ওদের উচ্ছেদ কি সম্ভব? মণি বেটা বললেন, তাহলে আমিও চাইনা আমার ভিটে-মাটি।

বঙ্গবন্ধু মণি সিংহের এই নির্লোভ নেতৃত্ব’কে শ্রদ্ধায় বাহবা জানালেন। এই আত্মত্যাগী নায়ক নিজ সম্পত্তি হাসিমুখে ছেড়ে সুসং এ আসলে বসবাস করতেন তাঁর প্রিয়ভাজন দূর্গা প্রসাদ তেওয়ারীর বাড়িতে।

কমরেড মণি সিংহ যখন শুনলেন সুসং কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য জমি নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে, ছুটে গেলেন বঙ্গবভনে, নাম মাত্র মূল্যে বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে সুসং কলেজকে পাইয়ে দিলেন ৩.৫৬ একর ভূমি। যা আজ নেত্রকোনা জেলা’র দুর্গাপুরে, সুসং মহাবিদ্যালয় নামে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে।

আমাকে আমার এক বন্ধু সুসং দুর্গাপুরে ঘুরতে এসে কমরেড মণি সিংহ’র স্মৃতিস্তম্ভে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিলো, এই মহান বিপ্লবী’র যে এত কীর্তি, যিনি লড়েছিলেন তোমাদের জন্য নিজ পরিবারের বিরুদ্ধে, তাঁর কোনো মূল্যায়ন কি তোমরা করতে পেরেছো? একটা স্কুল, একটা কলেজ বা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তো দেখলাম না উনার নামফলক, যদিও এই এলাকার সাধারণের শিক্ষা ব্যাবস্থার নিমিত্তে সূদুর গ্রামে তিনিই স্থাপন করেছিলেন বিদ্যালয়। আমি লজ্জায় নতমুখে, আত্মঘৃণায় নিজেকে তিরস্কৃত করলাম যদিও আমি অক্ষম এ কাজে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে সুসং কলেজকে,সরকারি কলেজ হিসাবে ঘোষণা করতে যাচ্ছে। স্বদ্বিচ্ছা থাকলে নামকরণ হতে পারে “কমরেড মণি সিংহ সরকারি মহাবিদ্যালয়”। পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন হতে পারে মণি সিংহের জীবনী ও অবদান

বাংলাদেশনিউজ
১৪.০১.২০১৬


Comments are closed.