>> প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনদিনের সফরে আবুধাবি পৌঁছেছেন >> সাকিবের ঘূর্ণিতে জিম্বাবুয়ে ২৪০ রানে অলআউট বাংলাদেশ ১ উইকেটে ২৭ >> ৩১ সৈন্য নিহত হবার পর মিশরের সিনাইয়ে জরুরী অবস্থা জারি >> মালিতে ইবোলা আক্রান্ত প্রথম রোগীর মৃত্যু >> হরকাতুল জিহাদের ৪ সদস্য বোমা ও বিস্ফোরকসহ গ্রেফতার ৬ দিনের রিমান্ডে >> জাম্বিয়ার স্বাধীনতা দিবসে নৌকা ডুবিতে কমপক্ষে ২০ জনের মৃত্যুর আশংকা >> লেবাননের ত্রিপোলি শহরে সংঘর্ষে নিহত ৬ সেনা >. বন্দুকধারীর গুলিতে তুরস্কের ৩ সেনা নিহত

বস্তি উচ্ছেদ : এ বৈষম্য থেকে সরকার ও প্রশাসনকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে

পর্যবেক্ষক

রোববার একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় সংবাদ শিরোনাম হয়েছে- “কড়াইল বস্তি : পুনর্বাসন ছাড়াই চলে উচ্ছেদ।” অন্য একটি দৈনিকে শেষ পৃষ্ঠায় ক্যাপশন হয়েছে “রেলের জায়গা থেকে ঝুপড়ি ঘর উচ্ছেদ করলে অজ্ঞান হয়ে পড়েন বৃদ্ধা আসাব বানু।”

প্রথমত: বিলাসবহুল বাড়ী নয়, মধ্যবিত্তের সাধারণ বাড়ী নয় অথবা ন্নি মধ্যবিত্তের টিনের ঘর নয় এমনকি দরিদ্রের ছনের ঘরও নয় বরং বস্তির পলিথিন পেপারে মোড়া ঝুপড়ি ঘর থেকে উচ্ছেদের কারণেই জ্ঞান হারিয়েছে আসাব বানু। অর্থাৎ ঝুপড়ি ঘরই তার চূড়ান্ত সাধ্যের বাসস্থান, শেষ আশ্রয়। সে শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর পর তার অসহায়ত্ব, দারিদ্রতা, আশ্রয়হীনতা এতই সঙ্গীন যে তার প্রাবল্যে সে জ্ঞান হারিয়েছে।

দ্বিতীয়ত: ক্যাপশনে উল্লিখিত ‘বৃদ্ধা’ শব্দটি আরো মর্মস্পর্শী। কারণ স্বাধীনতার পর ৪১ বছর পার হলেও রাষ্ট্রযন্ত্র তার বৃদ্ধা নাগরিক ‘আসাব বানুর’ জন্য কোন বাসস্থান তৈরি করতে পারেনি অথবা দিতে পারেনি। মূলত: এ রকম বৃদ্ধা শুধু এক আসাব বানু নয়। বরং খোদ ঢাকা শহরেই এরূপ লাখ লাখ আসাব বানু রাস্তার ফুটপাতে পলিথিনের ঝুপড়ি বানিয়ে থাকছে। অধিক বৃষ্টি হলে তাদের সে পলিথিন ছিঁড়ে যায়। মেঝেতে পানি ঢোকে। শীতের তীব্র বাতাসে তারা হিম শীতল হয়। অথচ বাসস্থান নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানেও মৌলিক অধিকার বলে গৃহীত। কিন্তু তার প্রয়োগ কোথায় ? কাজেই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রাষ্ট্রযন্ত্র নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে পুরোই ব্যর্থ। এ ব্যর্থতা সরকারের। এ লজ্জা সরকারের নীতি-নির্ধারকদের। মন্ত্রী-আমলাদের।

প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য গত ১২ই ফেব্র“য়ারি ভূমিমন্ত্রী সংসদে স্বীকার করেছেন দেশে ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা ৩১ লাখ ৯৯ হাজার ২৮১টি। আর এসব পরিবারের লোকসংখ্যা হচ্ছে এক কোটি ৪৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৬৪ জন। বর্তমান মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত এক লাখ এক হাজার ২৩৫টি ভূমিহীন পরিবারকে ৫২ হাজার ১৭৪ দশমিক ৮২ একর কৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে। তা ছাড়া ১৩৬টি গুচ্ছগ্রামে ছয় হাজার ২০২টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্পের আওতায় ১২৮টি টুইন হাউজ এবং রাজধানীর বস্তিবাসী ও নিম্নবিত্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে এক হাজার ৫৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছে।

গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত প্রতিবেদন অনুযায়ী সারা দেশে খাস জমির পরিমাণ ১৭ লাখ ৭৬ হাজার ৫১০ একর। এর মধ্যে অকৃষি জমির পরিমাণ হচ্ছে ছয় লাখ ৪৮ হাজার ৮৭৩ একর। আর কৃষি জমির পরিমাণ ১১ লাখ ২৭ হাজার ৬৩৭ একর।

দেশের প্রকৃত ভূমিহীনদের সম্পর্কে মন্ত্রীর বক্তব্য যেমন পরিপূর্ণ সত্য নয় বরং প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি, আর তার চেয়েও বড় দুঃখজনক হলো যে ভূমিহীনদের জন্য যে সরকারী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা সংসদে বলা হয়েছে তা মূলত: সরকার দলীয় ক্যাডাররাই বেশীরভাগ দখল করেছে। যেমনটি ভাসানটেকে বস্তিবাসীদের জন্য যে ফ্ল্যাট করা হয়েছে তাতে ববিাসী রা কোনো ঠাঁই পায়নি। রাজনৈতিক প্রভাবশালী বড়লোকেরাই তা দখল করেছে। দেশে বেসরকারী হিসেবে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা ৬২ শতাংশ। আর সারাদেশে বস্তিবাসীর সংখ্যা ১২ শতাংশ।

অপরদিকে প্রায় প্রতি দিনই পত্রিকার পাতায় বস্তিবাসীদের নিয়ে খবর হয়। গত এক সপ্তাহে পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হয়েছে-“গুলশান-বনানী লেকপাড়ে বস্তি উচ্ছেদ শুরু।”“মহাখালীর সাততলা বস্তি উচ্ছেদ।”এ ধরনের খবর পত্রিকার পাতায় অহরহ দেখা যায়।শুধু রাজধানী ঢাকায়ই নয় গ্রামাঞ্চলেও গড়ে উঠেছে বস্তি এবং সেসব বস্তিও উচ্ছেদ হচ্ছে। পত্রিকার পাতায় খবর হচ্ছে-“বস্তি উচ্ছেদে রাসিকের নয়া কৌশল।“বস্তি উচ্ছেদ ৭২টি পরিবার অসহায়।”“কুড়িগ্রামে ভূমিহীন পল্লীতে অগ্নিসংযোগ ? ২৫ পরিবার উচ্ছে।”

“কক্সবাজার বিমানবন্দরে ভূমি অধিগ্রহণে উচ্ছেদ হবেন ৩৫ হাজার উদ্বাস্তু।” “সোনারগাঁয়ে ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করে শিল্প-প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পাঁয়তারা।” “নোয়াখালীর চরাঞ্চলে ভূমি উদ্ধারের নামে দু’শতাধিক ভূমিহীন উচ্ছেদ : জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে ঘরবাড়ি।”

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় দেশের ভূমিহীন মানুষ বা বস্তিবাসীরা কোন মানুষই নয়। তাদের বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলো বিত্তবানদের বিনোদন। দেশের অধিকাংশ বস্তি উচ্ছেদ করে মূলত: বিত্তবানদের বিনোদনের উদ্দেশ্যেই কাজে লাগানো হচ্ছে। খবর এসেছে-“বস্তি উচ্ছেদ করে রংপুরে মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ।”

বলাবাহুল্য, অন্যসব বস্তি উচ্ছেদেও মূলত: বিত্তবানদের বিনোদন বিলাসিতা পূরণ করা হয়। অর্থাৎ দেশে বর্তমানে গরীবদের উপর চলছে চরম শোষণ এবং পরম বৈষম্য। অথচ শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থার কথা বলেই সব রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে। আর বৈষম্য সাংবিধানিকভাবেই পরম ধিকৃত। অর্থাৎ এদেশের ক্ষমতাসীনরা যেমন ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিশ্র“তি পূরণ করেননা, তেমনি তারা সংবিধানও মানেন না। বাস্তবে প্রতিফলিত করেন না।

দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে চল্লিশ শতাংশেরও বেশি মানুষ। যারা তিনবেলা খেতে পারছে না। কিন্তু এসব অনাহারী, বাস্তুহারা জনগণের জন্য সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই। সরকার মহাপরিকল্পনা করে বিশ্বকাপ ক্রিকেট, বিমানবন্দর, গভীর সমুদ্র বন্দর, ইভিএম প্রজেক্ট ইত্যাদি নিয়ে। অথচ দেশের ৬ কোটির ঊর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ভাত, কাপড়, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা তথা সাংবিধানিক কর্তব্য পালনে সরকার নির্বাক, নিষ্ক্রিয়, নিস্তেজ, নিথর ও নীরব। এ নীরবতা চরম দুঃখজনক ও গভীর লজ্জাকর। এটা চরম বৈষম্যমূলক এবং নির্মম নিস্পেষণ ও নির্যাতনের বহিঃপ্রকাশ। এ বৈষম্য থেকে, এ নির্লজ্জ আচরণ থেকে সরকার ও প্রশাসনকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম


Comments are closed.