>> কোথাও কোথাও মাঝারি ধরণের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে >> স্পেনের বার্সেলোনায় পথচারীদের উপর ভ্যান নিহত ১৩ আহত ৫০ >> সিরিয়ায় মার্কিন জোটের বিমান হামলায় ৬ বেসামরিক ব্যক্তি নিহত

হারিয়ে গেছি আমি

রুমানা নাহীদ সোবহান

Rumana Nahid Sobhan 1বেলা শেষের বেলা। সোনালী বিকেলে বা বরফ ঢাকা মন্ট্রিয়লের সন্ধ্যায় ঘর মুখো হলেই প্রায়শই, মনে হয় কে যেন আমায় ডাকে। ডাকটি খুব পরিচিত। চিরচেনা সেই কন্ঠ।

প্রতিবারই চমকে উঠে এদিক ওদিক তাকাই , ঠাহর করতে পারিনা তারপর বুঝি ডাকটি আসে মীরপুর কবরস্থান থেকে। এই পিছুডাক উপেক্ষা করতে চাই । শুনতে চাই না। কারণ ডাকটি শুনলেই আমার আবার দেশে ফিরে যাবার আকুল বাসনা জাগবে। ফিরে যেতে চাইব সেই কোলে যা ছিল এক নিরাপদ আশ্রয়।যে কোন কিছু থেকে নিবিড় আবেগে আগলিয়ে রাখার এক উদগ্রীব প্রচেষ্টা। সেই কোল তো হারিয়ে গেছে । নেই সেই নিরাপদ বেড়াজালের বাঁধন।

প্রতিটি বাবা দিবসে এখন আমি বলি সেইরবি ঠাকুরের ৫ বছরের “বামির” মত হারিয়ে গেছি আমি।কন্যা হিসেবে আমার অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে। আর কেঊ আসে না সকল অন্ধকারে প্রদীপ হাতে আলো জ্বেলে দিতে। ছায়াপথ থেকে নেমে আসে না কেঊ সমস্যা সমাধানের পথ দেখাতে। গানে গানে ভরে যায় না জন্মদিনের দিনগুলি। জীবনের খোলা প্রান্তর যেন বিস্তীর্ণ মরুভুমি। মরিচিকার মত দেখা যায় বাবাকে তারপর আবার সেই শূণ্যতা। মেঘে মেঘে এত খুঁজি তাকে কিন্তু বৃষ্টির মত নেমে আসে না আর কোথায়ও। সেই রূপকথার দিনগুলি তেপান্তরের মাঠে হারিয়ে গেল। দিন শেষের শেষ খেয়ায় কোন নিরুদ্দেশের পথে যেন পাড়ি দিল সেই চিরচেনা মানুষ টা যার নাম ছিল কাজী মাহবুবুস সোবহান, সবাই যাকে বিচারপতি কে এম সোবহান নামে জানতেন। আমার বাবা।

“ছোট্টপাখী চন্দনা” বাবার মুখের প্রথম গান। আমাকে কখনো কখনো ঘুম পাড়াতে গেয়ে উঠা। গানের সুরে ভরে ছিলাম আজন্ম। ভোরে ঘুম ভাংতেই আকাশ বানী কোলকাতার সুর ছড়িয়ে পড়তো কাজী হাউস এর উপর নীচ। আমার বাবা কাক ডাকা ভোরে উঠতেন আর সেই কাক ভোর থেকে শুরু হত রেডিও। বিবিসি থেকে শুরু করে শেষ হত গানের অনুষ্ঠান দিয়ে। গান শিখতে শুরু বাবার অদম্য আগ্রহে। কোন দিন ও ভোরে উঠে গলা সাধতে ইচ্ছা হত না কিন্তু ডাক দিয়ে যেতেন গলা সাধার জন্য। বিকেলে তার আসার আগেই গলা সেধে নিতাম নাতো কোর্ট থেকে এলেই বেসুরো গলায় গান শিখাতে শুরু করে দেবেন এই ভয়ে।

গানের কোন সুর ছিল না তার গলায় কিন্তু গান শুনত অনবরত। তা হোক না প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের । আমাদের একটা গ্রামোফোন ছিল আর বাবার সংগ্রহে ছিল অজস্র রেকর্ড। সেই গ্রামোফোনে শুনতাম সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত, হেমন্ত, কনিকা দের গান। জীবনের শেষ দিনেও তার খাটের মাথার কাছে ছিল সিডি প্লেয়ার। অনেক সময় সন্ধ্যায় বাতি অন্ধকার করে শুনতেন প্রিয় রবীন্দ্র সংগীত। রবি ঠাকুরের কবিতা মুখস্ত বলে যেতে পারতেন হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতাল এ ৭২ ঘন্টা জ্ঞান হীন থাকার পর নিজের মস্তিক আর স্মৃতি শক্তি পরখ করার জন্য অনবরত আব্বৃতি করে গেছিল “ সব পাখী ঘরে ফেরে”।

কিন্ত সব পাখী ঘরে ফিরলেও বাবা তো ফিরলেন না রমনা পার্ক থেকে। তার প্রিয় গানের দুইটি ছিল অন্যতম জীবনের শেষ সন্ধ্যা গুলোয় কেবলি শুনে গেছিলেন“ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু”। আর মজার ব্যাপার ইফতারের সময় সবাই যখন দোয়া দরুদ পড়ায় ব্যস্ত হত তখন বাবা গেয়ে উঠতেন “দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে”।

কবি তো ছিলেন না আমার বাবা তবু বাংলাদেশে কবিতা পরিষদ গঠিত হলে তার প্রতিটি সম্মেলনে অংশ নেয়া যেন তার ছিল অবশ্য কর্তব্য। বই মেলা ছিল তার আরেক প্রিয় ভূমি। বই না কিনে বাড়ি ফিরেছেন এমন তো হয় নাই কখনো। বই এর সংগ্রহ ছিল দেখার মত। ছোট পড়ার ঘর ছাড়িয়ে বই এর অবস্থান ছিল প্রতিটি ঘরে। এত বড় বাড়ী হওয়া স্বত্তেও বই ছিল ঠাঁসা ঠাসি করে। টেবিলের উপরে, চেয়ারের উপরে থাকতো তারা উপূড় হয়ে শুয়ে। চিরদিন পড়ার টেবিল রয়ে গেল অগোছালো। কাগজ পত্র, বই খাতা কলম সবই রয়ে গেল এলোমেলো।

বাগান আর গাছের শখ ছিল বাবার। যদিও অতবড় বাগান টা গুছানো হয় নাই। প্রতি শীতে একসাথে যেতাম সৌরভ নামের সেই নার্সারী তে। সংগ্রহ করতে নানা রকম মৌসুমী ফুলের চারা। তারপর সংগ্রহ চলতো বিভিন্ন করতেন বিভিন্ন অজানা অচেনা ফুল। সেটা বোধহয় ১৯৯৯ বরিশাল থেক নিয়ে এলেন ঝুমকো লতা বেগুনী রঙের ফুল। ৪০ এর দশকে বরিশালে কলেজে পড়াকালীন সেই ফুল দেখেছিলেন তাই এত বছর পর তাকে নিয়ে আসা।সারা বাগান জুড়ে ছিল শাদা রঙের লিলি ফুল। বরষায় এই ফুল ফুটে এক অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি করত।

দোলন চাঁপা সুবাস ছড়িয়ে পড়তো তার শোবার ঘর। জানালার ধারেই দোলন চাঁপার ঝাড় বিলাতো তাদের সৃষ্টি অকৃপণ হাতে। আর পড়ার ঘর সামনে ছিল রজনীগন্ধা। ভোরে কাঠের জানালা খুল্লেই চোখে পড়তো রাতে ফোটা সেই ফুলের মেলা। যেন প্রতিযোগিতা করে বলতো আমায় দেখো এই আমাকে। পুরো বাড়ীর দেয়াল ঘিরে ছিল নারকেল বিথী। সেই নারকেল বিথী এত উচু যেন আজ বাবাকে দেখার জন্য আকাশ ফুঁড়ে পৌছাবে তার কাছে। গেটের পাশে ছিল শিঊলি ফুল আর গন্ধরাজের গর্বিত অবস্থান। এদের পাশে ফুটতো লংকা জবা আর লাল কুসুম জবা। পাড়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজার জন্য এই ফুল গুলি যেন উতসর্গ করে দিয়েছিল।প্রতি ভোরে তারা কুড়িয়ে নিয়ে যেত তাদের পূজার ফুল। আজ সেই বাগান আর নাই সব ফুল শুকিয়ে গেছে , বাগান হয়েছে বিরান ভূমি। বাগানের প্রতিটি গাছ বাবা হারার দুঃখ নিয়ে মিশে গেছে ধুলি মাটি হয়ে। মালীবাগের সেই হলুদ রঙের কাজী হাউস আজ শ্মশান। দিবা রাত্র সেখানে বয়ে যায় নাই নাই এর হু হু রব।

Rumana and Km Sobhanহাতের লেখা তেমন সুন্দর ছিল না কিন্তু সেই হাতের লেখা চিঠি গুলি অনবদ্য। আমায় লেখা একটা চিঠির কথা মনে আছে যা আজো আমাকে জীবনের সকল কর্মে মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। বাবা তখন জার্মানীতে রাষ্ট্রদূত আর আমি ঢাকায় এইচ এস সি এর প্রস্ততি নিচ্ছি। প্রস্তুতি আর সম্ভাব্য ফলাফলের জন্য গীতার উদ্ধৃতি দিয়ে জানালেন “মানুষ তার কর্মএর জন্য দায়ী ফলের জন্য নয়”। চিঠি গুলিতে কখনো আদেশ থাকতো না থাকতো জীবন চলার মন্ত্র।

বাবা ছাড়াও আমার জীবনে ছিল বাবার মতো আরো অনেক মানুষ। দুঃখের বিষয় তাদের প্রত্যেকের নামের আগেই আজ লিখতে হয় প্রযাত। ছিলেন বড় ফুপা আবুল কাশেম। যিনি আমার শিক্ষা জীবনের শেষ পরীক্ষা দেয়ার সময়ও আমাকে নজরবন্দী রাখেছিলেন। পরীক্ষার আগেই মনে করিয়ে দিতেন “examination is knocking at the door”. আমি রাত জেগে পড়ছি কিনা তা উনি তার বাড়ীর জানালা দিয়ে লক্ষ্য করতেন। খালু মোহম্মদ আলম যে কোন প্রয়োজনে্র সিপাহসালার । আমার বিয়েতে সব কিছু তদারকির ভার তার উপর দিয়ে আমার বাবা মা ছিলেন নিশ্চিন্ত। তিনি আমার বিয়েতে একাধারে ছিলেন মুরুব্বী আর শালা শালীদের বন্ধু। প্রতি শবে বরাতে যাবতীয় পটকা, মোমবাতি, তারাবাতি , রঙ্গিন দেশলাই সব কিছুর যোগানদার ছিলেন তিনি। ছোট খালু নাসিরুদ্দীন আহমেদ বিলেতবাসী মনস্তত্ত্ববিদ অনেক জটিল মনস্তত্তের সরল সমাধান করে দিয়েছিলেন আমার পরিনত বয়েসে্র জীবনে। একমাত্র মামা কাজী মোশাররাফ হোসেন। তার স্নেহের নহরে সিক্ত ছিলাম আমি। আমার জন্মদিনে সব সময় দুটো কেক থাকতো একটা কেক অবশ্যি তার আনা। হালফ্যাসানের চুল কাটাতে নিয়ে যেতেন আমাকে তখন কার দামী বিউটি পারলারে, প্রতি শনিবারে চকোলেট দিতেন আমাদের নিয়ম করে। সিনেমা দেখাতেন। রবিনসন ক্রুসো দেখিয়েছিলেন সেটা ছিল আমার প্রথম হলে যেয়ে সিনেমা দেখা। রশীদ আহমেদ সম্পর্কে নানা একজন চিত্রশিল্পী যার তুলির টানে বিমূর্ত ছবি হয়ে উঠতো মূর্ত। আমার একটা পোর্ট এট একে দিয়েছিলেন আমার ৯ বছর বয়সে।

আরেক জন ছিলেন যার কথা কখনই বুঝিয়ে বলতে পারবো না। রক্তের সম্পর্কের সব নিয়ম নীতিকে ভুল প্রমান করে তিনি হয়েছিলেন প্রানের চেয়ে প্রিয়। সম্পর্কের এক নতুন অর্থ তিনি আমার অভিধানের ঝুলিতে ভরে দিয়েছিলে। তার নাম ব্যরিস্টার শওকত আলী খান। আমার আরেক বাবা। বাবার সাথে ইনিও আমার মাথায় ধরে রেখেছেন ভালবাসার এক বিশাল ছাতা।

নিরাপত্তার এক বিস্তীর্ণ সামিয়ানা। যে ঘাসে ঘসে পা ফেলেছি সেই ঘাসের চোরা কাটা গুলি সরিয়ে দিয়ছিলেন তিনি।

আমি জানিনা আজ এরা আকাশের কোথায় কোন তারা হয়ে আছেন। কখন তাদের দেখা যায়। শুধু জানি যে আলোর নদী এরা পার হয়ে ঢেউএর সাথে ভেসে গেছেন সেই আলোর নদীর ওপর পারে এরা আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন আমার সময় হলেই এরা আবার আমাকে তাদের নিরাপদ কোলে স্থান দেবেন। আবার বলবেন “কেমন আছিস রে মা”।

সবাই কে হারিয়ে আজ ছত্রীবিহিন এক কণ্টকাকীর্ণ জীবন পথ অতিক্রম করছি। নিঃস্বতা আর নৈশব্দ্যের সাথে পার হয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর। আর বাজেনা ফোন, পাইনা চিঠি, আসেনা উৎসবে আনন্দে শুভাশীষ। হারিয়ে গেছে আমার সেই আদরের ডাক। কোথাও নাই আমার সেই ইচ্ছা পূরণের ঝুলি, নেই আমার মুস্কিল আসান।

বাবা দিবস আজ পৃথিবীর সব বাবাহীন মেয়েদের জন্য রইল আমার সহানুভূতি আর সমবেদনা।

বাংলাদেশনিউজ
২০.০৬.২০১৫


Comments are closed.