>> ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন বিমান হামলায় নিহত আরও ৬১

ঘুরে আসুন ভিতর বাড়ীর সৌন্দর্যের লীলাভূমি খাগড়াছড়ি

জীতেন বড়ুয়া

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি খাগড়াছড়ি। অসংখ্য পাহাড়ে নানারকম গাছ এবং আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু ঢেউ তোলা সবুজ পাহাড়ের বুকচিরে কালো পিচের সর্পিল রাস্তা দিয়ে পথ চললে যে কোন পর্যটকের মন কাড়বেই। শীত ফোঁটা চেংগী নদীর তীরের কাঁশফুল, হরেক রঙের পাহাড়ী ফুল, চন্দ্র সূর্যের রূপালী স্পর্শ, নদী, হৃদ, পাহাড়ী ঝর্ণা সবাইকে হাতছানী দিয়ে ডাকছে পার্বত্য এলাকা খাগড়াছড়ি। ১০০০ ফুট উচু পাহাড়ের পাদদেশে পাহাড় ভেদ করা রহস্যময় সুড়ঙ্গপথ, ১৩০০ ফুট উচু পাহাড়ের উপর দেবতা পুকুরে শীত গ্রীষ্মে সমান পানি থাকা, হাতির মাথার আকৃতির পাহাড়, এত সব দৃশ্যমান বিঘয়গুলো পর্যটকদের কাছে টানে। আবার এর রহস্যময় সৌন্দর্য দেখলে মনে হয় এ যেন এক রূপগল্পের স্বপ্নপুরী। তাছাড়া এখানে আকাশ ছুঁয়েছে মাটিকে, পাহাড়ের বুকভেদ করে উঠে পূর্ণিমার চাঁদ। এসব দেখতে হলে আপনাকে অবশ্যই আসতে হবে খাগড়াছড়িতে।

আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র আলুটিলা : সৌন্দর্য্যরে আকড় খাগড়াছড়ি শহরের প্রবেশ পথ আলুটিলা। জেলা সদর থেকে ৮ কি.মি. পশ্চিমে এ আলুটিলা। প্রায় হাজার ফুট উঁচু এ ভূ-নন্দন জায়গাটি বাংলাদেশের একটি অন্যতম ব্যতিক্রমধর্মী পর্যটন স্পট। এই পর্যটন কেন্দ্রে আছে দর্শনার্থীদের বসার জন্য পাকা বেঞ্চ, বিশ্রামের জন্য পাকা ছাউনী, পর্যবেক্ষণের জন্য টাওয়ার ইত্যাদি। টিলার মাথায় দাঁড়ালে শহরের ভবন, বৃক্ষ শোভিত পাহাড়, চেঙ্গী নদীর প্রবাহ ও আকাশের আল্পনা মনকে মুগ্ধতায় ভরে তোলে। চোখে পড়ে আঁকাবাকা উচুঁ নিচু ঢেউ তোলা সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে ইটের রাস্তা। পাহাড়ী জুমিয়াদের ছোট ছোট মাচার তৈরি জুমঘর। আলোক নবগ্রহ ধাতু চৈত্য বৌদ্ধ বিহার আর সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি চমৎকার ডাকবাংলোও রয়েছে এখানে। প্রাকৃতিক নৈসর্গের এ স্থানটিকে আরো আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে এখানে ইকো-পার্ক স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ যায় বলে মনে করেন অনেক পর্যটক।

গা ছম ছম করা অনুভূতি নিয়ে পাহাড়ী সুরঙ্গ পথ বেয়ে পাতালে নেমে যাওয়া যায় আলুটিলার সুরঙ্গে। পাহাড়ের পাদদেশ বেয়ে গুহার মুখ পর্যন্ত যেতে দর্শনার্থীদের এক সময় খুব কষ্ট হতো। এখন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে সেখানে পাকা সিঁড়ি করে দেয়া হয়েছে। পাহাড়ের চুড়া থেকে ২৬৬টি সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামলেই পাওয়া যায় সেই স্বপ্নীল গুহামুখ। আলুটিলা সুরঙ্গের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮২ফুট। গাঢ় অন্ধকার এ গুহায় আগুনের মশালসহ ঢুকতে হয় কিছুটা সাহস নিয়েই। গুহায় আলো আধাঁরীর মাখামাখিতে এক অপরূপ দৃশ্যের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। ভেতরে অবিরাম ঝিরঝির ছন্দে ছুটছে হিম শীতল ঝরনার স্বচ্ছ পানি।

জেলা সদর থেকে ৫ কি.মি. দক্ষিণে খাগড়াছড়ি-মহালছড়ি সড়কের মাইসছড়ি এলাকার নুনছড়ি মৌজার আলুটিলা পর্বত শ্রেণী হতে সৃষ্টি হয়েছে ছোট্ট নদী নুনছড়ি। এই নদীর ক্ষীণ স্রোতের মাঝে রয়েছে প্রকান্ড পাথর। স্বচ্ছ জলস্রোতে স্থির পাথর মোহিত করে, প্রকৃতির অপূর্ব সাজে মুগ্ধতায় শিহরিত হয় মন। সমুদ্র সমতল হতে ৭০০ফুট উঁচু পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত এই পুকুরকে বলা হয় দেবতার পুকুর। পাঁচ একর আয়তনের এ পুকুরটির স্বচ্ছ জল মুহূর্তের মাঝে হৃদয় মন উদাস করে দেয়। পুকুরের চারপাশে ঘন বন, যেন সৌন্দর্য্যরে দেবতা বর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশ্বাস জল তৃষ্ণা নিবারণের জন্য স্বয়ং জল-দেবতা এ পুকুর খনন করেন। প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নর-নারী পূণ্য লাভের আশায় এই পুকুর পরিদর্শনে আসে।

অপূর্ব বিস্ময়ের আরো কিছু টিলা : জেলার মাটিরাংগা উপজেলা থেকে সোজা উত্তরে ভারত সীমান্তে রয়েছে ভগবান টিলা। জেলা সদর থেকে এর কৌণিক দূরত্ব আনুমানিক ৮৫ কি.মি.। ঘন সবুজের ভিতর আঁকা-বাঁকা রাস্তা দিয়ে যতই এগিয়ে যাওয়া যায় পাহাড়ের অপরূপ নৈসর্গে অপলক নেত্র ততই বিস্ময়-বিহ্বল হয়। সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ১৬০০ফুট উঁচু এ টিলার প্রাচীন নাম ‘ভগবান টিলা’। প্রাচীন লোকজন মনে করতেন, এতো উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে ডাক দিলে স্বয়ং স্রষ্টাও তা শুনতে পারেন। সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে দাঁড়ালে মনে হয়, আপন অস্তিত্ব শূন্যের নিঃসীমতায় হারিয়ে গেছে। ঘন সবুজ বাঁশের ঝোপ, নাম-না জানা পাখির ডাক, পাহাড়ের নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝর্ণার জীবন্ত শব্দ-সবকিছু মিলিয়ে নিজেকে হারিয়ে যাওয়ার এক অনন্য নৈসর্গিক স্থান এটি।

প্রকৃতির আরেক অপূর্ব বিস্ময় দুই টিলা ও তিন টিলা। জেলা সদর থেকে ৪২ কি.মি. দুরে খাগড়াছড়ি-দিঘীনালা-মারিশ্যা রাস্তার কোল ঘেঁষে এই টিলায় দাঁড়ালে ভূগোল বিধৃত গোলাকৃতি পৃথিবীর এক চমৎকার নমুনা উপভোগ করা যায়। পাহাড় চুড়ায় দাঁড়িয়ে যেদিকে চোখ যায় মনে হয় যেন পৃথিবীর সমস্ত সবুজের সমারোহ এখানেই সমষ্টি বেঁধেছে।

দর্শনীয় ও উপভোগ্য বিভিন্ন স্থান : জেলার রামগড় সীমান্তের গা ঘেষে খাগড়াছড়ি-ফেনী সড়কের দু-ধারে গড়ে উঠেছে বিশাল চা বাগান। যা খাগড়াছড়ির পর্যটন শিল্পকে করেছে আরো সমৃদ্ধ। বিশাল এলাকা জুড়ে এই চা বাগানে এলে পর্যটকরা বুঝতেই পারেন না তারা সিলেটে না খাগড়াছড়িতে আছেন।

এই জেলার অন্যতম দর্শনীয় ¯হান মানিকছড়ি মংসার্কেল চীফ (মংরাজা)-এর রাজবাড়ী এবং এর স্থাপত্য। রাজার সিংহাসন, মূল্যবান অস্ত্রশস্ত্রসহ প্রতœতাত্ত্বিক অনেক স্মৃতি বিজড়িত স্থান এটি।

নির্মাণ শৈলীর এক অপূর্ব নিদর্শন খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেল। সাম্প্রতিককালে নির্মিত এ মোটেলটি শহরের প্রবেশ মুখেই,পাশে বয়ে যেছে চেঙ্গীর শান্ত স্রোত। কোন এক পূর্ণিমার রাতে চাঁদের নরম আলোয় নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাইলে খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের বিকল্প নেই।

খাগড়াছড়ি শহর থেকে তিন কি.মি. পূর্বেই কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। সবুজের অফুরন্ত সমারোহ আর স্বপ্নীল আবেশে নিজেকে ভোলাতে চাইলে কৃষি গবেষণা কেন্দ্র হতে পারে উপযুক্ত স্থান। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী আসে শুধু সবুজের স্নিগ্ধতা মন্থনের আশায়।

মাটিরাংগা উপজেলার খেদাছড়ার কাছাকাছি এলাকায় শতায়ুবর্ষী বটবৃক্ষ শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নয়, এ যেন দর্শনীয় আশ্চর্য্যরে কোন উপাদান। পাঁচ একরের অধিক জমির উপরে এ গাছটি হাজারো পর্যটকের কাছে দারুন আকর্ষণীয়। কথিত আছে, এ বটবৃক্ষের নীচে বসে শীতল বাতাস গায়ে লাগালে মানুষও নাকি শতবর্ষী হয়।

দর্শনীয় আরো অনেক কিছু : প্রকৃতির আরো এক রহস্য হাতির মাথা আকৃতির একটি পাহাড় আছে এখানে। পেরাছড়া গ্রামের এই পাহাড়টি দেখতে হাতির মাথার মত মনে হয়। কয়েকটি ছোট ছোট পাহাড় পার হয়ে ৩০/৩৫ ফুট উচ্চতার এই পাহাড়টিকে দেখতে হয় বাঁশের সিড়ি বেয়ে। এই বাঁশের সিড়িতে উঠা মানে হাতির শুরের উপরে উঠা আর সামনে চলা মানে শুর বেয়ে হাতির মাথায় অর্থাৎ পাহাড়ের মাথায় উঠা। পাহাড়ে উঠার পর দেখা যায় প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য।

জেলার পানছড়ি উপজেলায় নির্মিত হয়েছে শান্তি অরণ্য কুঠির। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মুর্তি। যা দেখার জন্য ভীড় করছে শত শত পর্যটক।

এসব ছাড়াও মহালছড়ি হ্রদ, দিঘীনালা বড়াদম দীঘি, জেলা সদরের ধর্মপুর আর্য বন বিহার, খাগড়াছড়ি শাহী জামে মসজিদ, দীঘিনালার বন বিহার ইত্যাদি চমৎকার দর্শনীয় স্থান।

সূত্রঃ বাসস
বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম


Comments are closed.