>> ঢাকা সিএমএম কোর্টে জামিন জালিয়াতিতে পাঁচজনের ১৪ বছর করে কারাদণ্ড >> সিরিয়ার রাকায় স্কুলে মার্কিন বিমান হামলায় নিহত ৩৩ >> ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বাইরে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ৪

৪৩ বছরেও বীরাঙ্গনা আরিনা সরকারী স্বীকৃতি পান নি

বিশ্বজিৎ রায়, মৌলভীবাজার

:: যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করে অসহায় মুক্তিযোদ্ধা স্বামী

Birangona-arina-begum১৯৭১ এর মহান মুক্তি সংগ্রামে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সাহসী সন্তানরা যেমন গৌরবোজ্জল ভূমিকা রেখেছিলেন, তেমনি পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে সম্ভ্রম হারিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন এ উপজেলার অনেকেই। মোছাঃ আরিনা বেগম এদেরই একজন। স্বাধীনতাযুদ্ধে সম্ভ্রম হারানো এ বীরাঙ্গনা এখন দিন কাটাচ্ছেন নিদারুণ অর্থকষ্টে। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পার হলেও বীরঙ্গনা আরিনার ভাগ্যে জুটেনি নুন্যতম স্বীকৃতি। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করে এখন অসহায় মুক্তিযোদ্ধা স্বামী।

কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের বড়চেগ গ্রামের বাসিন্দা আওয়ামীলীগের একনিষ্ঠ কর্মী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মোতালিব মিয়ার স্ত্রী আরিনা বেগম। ১৯৭০ সালের সাধারন নির্বাচনের মাত্র ৩দিন আগে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামী মোতালিব মিয়া শ্রমিকের কাজ করতেন চট্টগ্রাম জেনারেল আয়রন এন্ড ষ্টীল মিলে।

চাকুরীর সুবাদে তখন শ্রমিকনেতা এম, এ, হান্নান, জহুর আহমদ চৌধুরী প্রমুখ প্রখ্যাত রাজনীতিবিদদের সান্নিধ্য লাভের কারণে যুবক মোতালিব আওয়ামীলীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসাবে জড়িয়ে পড়েন ’৬৮ এর ৬ দফা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে।

২৫শে মার্চ ঢাকায় গণহত্যার সংবাদ পরদিন চট্টগ্রামে পৌঁছলে মোতালিব ৭ দিন পায়ে হেটে ১লা এপ্রিল কমলগঞ্জের বড়চেগ এসে পৌঁছান। তখন মৌলভীবাজারের শেরপুরে পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ চলছিল। বাড়ী এসে মোতালিব এলাকার আওয়ামীলীগ কর্মী মনাফ মিয়া, ইছাক মিয়া, মখলিছুর রহমান প্রমুখদের সাথে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ ও খাবার সংগ্রহ করে তা পৌঁছানোর কাজ শুরু করেন।

বিষয়টি আঁচ করতে পেরে পাক হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসররা বেশ কবার হাতে নাতে ধরার প্রচেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়। অগত্যা তিনি বাধ্য হয়ে এলাকা ত্যাগ করে প্রথমে মৌলভীবাজারের শ্যামেরকোনা গ্রামে ও পরে রাজনগরের নিদিরমহল গ্রামে আত্মগোপনে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবারের ব্যাবস্থা করতে থাকেন।

পরিস্থিতি যখন ভয়াবহ তখন ২৫শে অক্টোবর রাতে পরিবারের লোকজনের সাথে শেষবারের জন্য দেখা করতে এলে ধরা পড়েন রাজাকারদের হাতে । রাজাকার ছিদ্দেক ও মস্তফা মিয়ার নেতৃত্বে ৭/৮ জন সশস্ত্র লোক রাতের আধারে বাড়ী ঘেরাও করে ঘরের দরজা ভেঙে মোতালিবকে আটক করে হাত-পা বেঁধে আমানুষিক নির্যাতন চালায়। হানাদারদের হাত থেকে রেহাই পাননি তার অসুস্থ মা, ছোট ভাই-বোন ও স্ত্রী আরিনা বেগমও। নরপশুরা বাড়ীর সবার সামনে তার স্ত্রী আরিনা বেগমকে জোরপূর্বক বিবস্ত্র করে পর্যায়ক্রমে পাশবিক নির্যাতন চালায়।

ঐদিন রাতেই চোখ বেঁধে মোতালিবকে নিয়ে যাওয়া হয় চৈত্রঘাট রাজাকার ক্যাম্পে। ২৬ শে অক্টোবর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মৌলভীবাজার সার্কিট হাউজ এলাকাস্থ পাক বাহিনীর নির্যাতন সেলে। সেখানে টানা ১০দিন নির্যাতনের পর ৪ ডিসেম্বর মোতালিবসহ ৩ জন বন্দীকে নিয়ে যাওয়া হয় তৎকালনি এসডিও বাংলোয় অবস্থানরত পাক মেজর আজিজের সন্মুখে। সেখান থেকে তার সাথের অপর ২ জনকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হলেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান মোতালিব। তার প্রাণহারার আকুতিতে গলে যায় পাক মেজরের মন। তাকে হত্যা না করে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়।

৭ নভেম্বর তারিখে একইভাবে ধৃত ও নির্যাতনের শিকার হয়ে জেল হাজতে প্রেরিত হন তার অপর সহযোগী ইছাক মিয়াও। মাসাধিককাল কারাভোগের পর ৮ ডিসেম্বর তারিখে মিত্রবাহিনী মৌলভীবাজার শহর আক্রমন করে জেলের দরজা ভেঙে বন্দীদের মুক্ত করলে তারা দু’জনও মুক্ত হন।

দেশ স্বাধীনের পর বিগত ১৯৭৯ সালে মোতালিব ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় তিনি বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তুু বিধি বাম, সেখানে এক সড়ক দূর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন। এ কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখের বাধ ভাঙ্গা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে আরিনার।

চার কন্যা সন্তানের জনক মোতালিব সেই থেকে অদ্যাবধি আর্থিক দৈন্য’র কারণে তার পরিবার পরিজনদের নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করলেও সরকারী সাহায্যের ছিটেফোটাঁও তার ভাগ্যে জোটেনি। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কিংবা সরকারী-বেসরকারীভাবে কেউই এই অসহায় পরিবারটির জন্য সাহয্যের হাত বাড়ানোতো দূরের কথা খোঁজ নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেননি। পায়নি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের স্বীকৃতিটুকুও। কমলগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দসহ অনেকেই বিভিন্ন সময়ে মোতালিবের পরিবারকে অনেক আশ্বাস দিলেও স্বাধীনতার এই ৪৩ বছরেও সেই আশ্বাস আর আলোর মুখ দেখেনি। বিগত মহাজোট সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রণয়ণ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঘোষনা দেওয়ায় তারা সিদ্ধান্ত নেন আদালতে এলাকার যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের। অতঃপর গত ২০০৯ সালের ১লা জুলাই তারিখে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোতালিব নিজে বাদী হয়ে মৌলভীবাজার অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্যাট আদালতে কমলগঞ্জের কুখ্যাত রাজাকার ছিদ্দেক মিয়া সহ ১৫ জনকে আসামী করে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। কিন্তুু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আইনজীবিদের ফি না যোগাতে পারায়  মৌলভীবাজারে  কোন আইনজীবির সহায়তা না পাওয়ায় তাকে নিজেই বিগত ২ বছর মামলাটি পরিচালনা করেন। মোতালিব মিয়া জানান, বিজ্ঞ আদালত মামলাটি ঢাকায় ট্রাইবুনালে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য নিম্ম আদালতকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত মামলার খবর তিনি জানেন না।

এদিকে মামলার অভিযুক্তরা এখনও এলাকায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মোতালিবের পরিবারকে নানা প্রকার হুমকী ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে চলছে। আলাপকালে আরিনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আওয়ামীলীগের একজন একনিষ্ট কর্মী ও একজন মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্বেও এই মামলার ব্যাপারে তার স্বামী কারো কাছ থেকে কোন সহযোগীতা পাচ্ছেন না। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের বিচার যখন এই স্বাধীন বাংলার মাটিতে হয়েছে। দেশে বর্তমানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। আশা করি এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও অবশ্যই একদিন হবে। তার পরিবারও অবশ্যই ন্যায় বিচার পাবে। বীরাঙ্গনা আরিনাদের বুকে লালিত এই স্বপ্ন বাস্তব রূপ লাভ করুক এটাই আজকের দিনের প্রত্যাশা।

আলাপকালে কমলগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার সৈয়দ মখলিছুর রহমান জানান, দীর্ঘদিনেও আরিনা বেগম বীরঙ্গনা ও মোঃ মোতালিব মিয়ার মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি না পাওয়া অত্যন্ত দু:খজনক। আমরা তাদের ব্যাপারে সকল তথ্য সম্বলিত আবেদন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) এ প্রেরণ করেছি। আশা করি বর্তমান সরকারের আমলেই তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হবে।

bdn24x7.com, বাংলাদেশনিউজ,  প্রতিনিধি, এসএস, জের, ১৬.১২.২০১৪


Comments are closed.