>> ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন বিমান হামলায় নিহত আরও ৬১

স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পাননি প্রভা রানী মালাকার

বিশ্বজিৎ রায়, মৌলভীবাজার

Prova Raniমৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের প্রভা রানী মালাকারকে এলাকার কিছু মানুষ ব্যঙ্গ করে এখনও পাঞ্জাবির বউ বলে ডাকে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাকে মায়ের সামনে থেকে ধরে নিয়ে স্থানীয় রাজাকাররা তুলে দেয় পাকিস্তানী আর্মির হাতে। সে সময়ের ১৬ বছরের প্রভা রানীকে দুই বার রাজাকার ও পাঞ্জাবির হাতে গণ ধর্ষনের শিকার হতে হয়। তার বাড়ী কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজার ইউনিয়নের মির্জানগর গ্রামে। স্বাধীনতা লাভের ৪৩ বছর পার হলেও সেই হতভাগ্য মহিলার ভাগ্যে এখনও জুটেনি বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি। পাননি কোন সরকারী সাহায্য সহযোগীতা। ছেলেকে মানুষ ডাকে জারজ সন্তান হিসেবে। এলাকার অনেক লোক তাকে ব্যঙ্গ করে ডাকে পাঞ্জাবীর বউ বলে। কেউ কোন দিন খোঁজ করেননি কেমন আছেন স্বামী হারা বীরঙ্গনা প্রভা রানী মালাকারের। ভাঙ্গা কুঁড়ে ঘরে থেকে দ’ুবেলা দু’মুটো ভাতের জন্য গ্রামে গ্রামে ফেরী করেন এই মহিলা। আর একমাত্র ছেলে কাজল মালাকার রিক্সা চালান। স্থানীয় ভূমিখেকোদের কারণে দখল হয়ে যাচ্ছে স্বামীর রেখে যাওয়া শেষ ভিটে-মাটিও। আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস পালন উপলক্ষে গত কমলগঞ্জে নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরুর অবদানে বীরঙ্গনা প্রভা রানী মালাকার সহ ৫ জয়িতাকে কে সম্মাননা ক্রেস্ট, সনদ ও ফুলের তোড়া প্রদান করা হয়।

Prova Rani Joyeetaসরেজমিন খোঁজ নিয়ে কমলগঞ্জের মির্জানগর গ্রামে তার বাড়ীতে হাজির হলে তিনি প্রথমে তেমন কিছু বলতে রাজি হননি। পরে অবশ্য কান্না জড়িত কন্ঠে করুন কাহিনী বর্ণনা করেন। আজ থেকে ৪৩ বছর আগের কথা সঠিক দিন তারিখ তার মনে নেই। তারপরও অবলীলায় বললেন, বৈশাখ মাসে তার বিয়ে হয় আর শ্রাবন মাসে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তখন স্বামী কামিনী রাম মালাকার চলে যান ভারতে। তিনি (প্রভা রানী) চলে যান বাবার বাড়ী পাশ্ববর্তী গ্রাম বিক্রমকলসে। মাস পনের দিন পর বিক্রম কলস গ্রামের রাজাকার নজির মিয়া ও জহুর মিয়া একদিন গোধুলী লগ্নে প্রভা রাণীকে তার মায়ের সামনে থেকে জোর পূর্বক তুলে নিয়ে যায় পাশ্ববর্তী বাদল মাষ্টারের বাড়ী। তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন দৌড়ে পালাবেন কিন্তু তাদের হাতে বন্দুক থাকায় গুলিতে মরে যাওয়ার ভয়ে আর পালাননি। যেখানে পাকিস্তানী আর্মিরা অবস্থান নিয়েছিল। সে রাতে বাদল মাষ্টারের বাড়ীতে অবস্থান নেয়া সকল আর্মি কেড়ে নেয় তার ইজ্জত। পরদিন সকালে আর্মিরা তাকে ছেড়ে দিলে তিনি আশ্রয় নেন তার বোনের বাড়ী জাঙ্গাল হাটি গ্রামে। সেখানে কয়েকদিন আত্মগোপন করে থাকেন। কিন্তু বিধি বাম ২০/২৫ দিন পর রাজাকার কাদির, রইছ, ইনতাজ, জহুর আবার পেয়ে যায় তার সন্ধান। শত চেষ্টা করেও প্রভা রানী তাদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেননি। যে দিন রাজাকাররা জাঙ্গাল হাটি প্রভা রানীর বোনের বাড়ী হানা দেয় তখন নিজেকে রক্ষার জন্য প্রভা রানী ধানের বীজের জমির আইলের নীচে আশ্রয় নেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। রাজাকার ইন্তাজ, জহুর, রইছ, কাদির সেখান থেকে তাকে জোর করে ধরে নিয়ে আসে। তখন প্রভা রানীর বোন বাঁধা দিলে তার মাথায় রাজাকারদের হাতে থাকা লাইট দিয়ে আঘাত করা হয়। এ সময় স্থানীয় গফুর মিয়া তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসায় তিনিও তাদের হাতে লাঞ্চিত হন। রাজাকাররা প্রভা রানীকে ধরে নিয়ে আসার সময় তাদের পালিত কুকুর তার কাপড় ধরে টানতে থাকে। সোনারার দিঘির পার পর্যন্ত কুকুরটি আসার পর সেটিকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। এক সময় প্রভা রানীকে নিয়ে আসা হয় শমশেরনগর ডাক বাংলোয়। যেখানে ছিল পাকিস্তানী আর্মিদের ক্যাম্প। সারা রাত পাকিস্তানী আর্মিরা তাকে পর্যায়ক্রমে ধর্ষন করে। নিজেকে বাঁচানোর সকল চেষ্টা করেও তিনি রক্ষা পাননি। অনেক কাকুতি-মিনতি করেছিলেন আর্মিদের নিকট কিন্তু কোন লাভ হয়নি। এক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন প্রভা রানী। সারা রাত তাকে কঠোর নির্যাতনের পর সবাই চলে গেলে তিনি এক সময় কোন রকম হেটে হেটে নিজের বোনের বাড়ী আবার চলে যান।

Pic----Prova Ranir Poribarপ্রভা রানী জানান, এক সময় জয় বাংলা হয় দেশে। অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হয়। তখন তার স্বামী ভারত থেকে দেশে এসে তাকে স্বামীর বাড়ী আনতে গেলে তিনি আসতে রাজি হননি। সবকিছু খুলে বলেন স্বামীর নিকট। উত্তরে স্বামী বলেছিলেন তোমার মতো হাজার হাজার নারী ইজ্জত দিয়েছে দেশের জন্য। তুমি তাদের একজন। আমার কোন দুঃখ নেই। এক পর্যায় প্রভা রানী চলে যান স্বামীর বাড়ী। দেশ স্বাধীন হবার এক বছর পর তার এক ছেলের জন্ম হয়। কিন্তু সেই ছেলেকে এক ধরনের নরপশুরা পাঞ্জাবির ছেলে হিসেবে ডাকে। অনেক মানুষ প্রভা রানীকেও ডাকে পাঞ্জাবির বউ বলে। আক্ষেপ করে প্রভা রানী বলেন, এলাকার মানুষের নিকট মুখ দেখানো যায় না। তার ছেলে কাজল মালাকার পেশায় একজন রিক্সা চালক। তাকে মানুষ কটাক্ষ করে। সুদীর্ঘ ৪৩ বছরে প্রভা রানী মালাকার মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তার উপর নির্যাতনের কথা ও দেশ স্বাধীনে দুই লাখ মা বোনের মত যে ভূমিকা ছিল তা সর্বত্র প্রকাশ করলেও এমনকি সবার জানা থাকলেও সেই স্বীকৃতি তিনি আজও আদায় করে নিতে পারেননি। উল্টো নানা হয়রানি, মামলা ও কঠুক্তি সহ্য করে চলেছেন আর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বীরঙ্গনা খেতাব আদায়ের জন্য।

গ্রামের সহজ-সরল মহিলা প্রভা রানী জানেনই না মুক্তিযুদ্ধের সময় যে নারী ইজ্জত দিয়েছেন সরকার তাদের বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়েছেন। তাই তিনি কোথাও কোন সময় প্রকাশ করেননি নিজের অবস্থানের কথা। আজও বীরাঙ্গনা খেতাব পাওয়ার জন্য আবেদন করেননি প্রভা রানী। দেশ স্বাধীন হবার পর বিভিন্ন সংস্থার লোকজন তার নিকট থেকে তাকে নির্যাতন করার কাহিনী সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু প্রভা রানী কোন সংস্থার লোকের নিকট তার কথা বলেছেন তা বলতে পারেননি। সে সময় তার ইজ্জত লুন্টন করা দলের  নজির, ইন্তাজ, ইদ্রিছ, রইছ পরবর্তীতে জেল কাটে। জেল থেকে বের হয়ে কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগরের ইদ্রিছ মিয়া প্রভা রানীর স্বামীর উপর মিথ্যা মামলা দেয়। যে কারনে তার স্বামীকে জেল কাটতে হয়। কয়েক বছর পর প্রভা রানীর স্বামী মারা যায়। স্বামী মারা যাওয়ার পর দু’বেলা দু’মুটো ভাত খাওয়ার জন্য প্রভা রানী বেঁচে নেন ফেরী করার কাজ। নিজের মাথার উপর টুকরী রেখে গ্রামে গ্রামে তিনি বিক্রি করছেন বিভিন্ন জিনিস পত্রাদি। এক সময় তার ছেলে কাজল মালাকার বিয়ে করে। বর্তমানে তার ৬ মেয়ে। ৯ সদস্য বিশিষ্ট পরিবারে একবার খেলে আরেকবার না খেয়ে থাকতে হয় তাদের। প্রভা রানী মালাকার মুক্তিযুদ্ধের সময় ইজ্জত হারানো কথা বর্ণনা দেয়ার সময় বার বার মূছা যাচ্ছিলেন। এরকম করুণ দৃশ্য যে কেউ দেখলেই অবশ্যই চোখের জলে বুক ভাসবে। প্রভা রানী মালাকার পাবে কি বীরাঙ্গার স্বীকৃতি? স্থানীয় সাংবাদিকদের মুখ থেকে প্রভা রানীর করুণ কথা শুনে তৎকালীন কমলগঞ্জ ইউএনও (বর্তমানে এডিসি-রেভিনিউ, মৌলভীবাজার) প্রকাশ কান্তি চৌধুরী ২০১০ সালে প্রভা রানী মালাকারের বাড়ীতে যান। এ সময় ইউএনও তাকে শাড়ী, চাল, ডাল, লবণসহ বেশ কিছু জিনিসপত্র প্রভা রানীর হাতে তুলে দেন। তিনি প্রভা রানীর ব্যাপারে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা বলছিলেন।

Prova Rani Picএ ব্যাপারে আলাপকালে কমলগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আব্দুল মুমিন তরপদার সমকালকে জানান, সাবেক মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডারের মাধ্যমে প্রভা রানীর সকল তথ্যাদি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছিল। বর্তমান মহাজোট সরকার বীরঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা ও স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরঙ্গণা ও শহীদ পরিবারের যে সকল তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়নি, সেসব তথ্যের জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আশা করি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রভা রানী অচিরেই বীরঙ্গনার স্বীকৃতি পাবেন। কমলগঞ্জ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাসহ সুশীল সমাজ  অবিলম্বে প্রভা রানীকে বীরঙ্গনার স্বীকৃতি প্রদান করে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা ভোগের সুযোগ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবী জানান।

বাংলাদেশনিউজ
১১.১২.২০১৪


Comments are closed.