>> নারী-শিশুসহ ভূমধ্যসাগরে পানিতে ডুবে ৩০ আভিবাসন প্রতাশীর মৃত্য >> আত্মঘাতী বোমা হামলায় জাকার্তায় ৩ পুলিশ নিহত ১০ জন আহত >> ইয়েমেনের রাজধানী সানা'য় হুথি পাল্টা হামলায় ২০ সৌদি ভাড়াটে সেনা নিহত

স্বাধীনতা সংগ্রামে কমলগঞ্জ

বিশ্বজিৎ রায়

bir sresto hamidur raaman saroni 1ইতিহাসের পত্রগুচ্ছে  আপন মহিমায় সমৃদ্ধ বাঙালী জাতী তার হাজার বছরের ইতিহাসকে বারবার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ভরিয়ে তুলেছে। সেই তীতুমীর, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন থেকে বরকত, সালাম হয়ে ১৯৭১ সালের সুমহান রক্তপ্রবাহ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামেই রয়েছে বাঙালী জাতীর ত্যেজোদ্বীপ্ত ভূমিকা। আর এই ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামেরই ফসল আজকের এই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

এদেশেরই উত্তর পূর্ব প্রান্তস্থিত এক সংগ্রামী জনপদ কমলগঞ্জ উপজেলা। বৃটিশ উপনিবেশিক শাসন ও জমিদারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এই উপজেলাবাসী যেমন রুখে দাড়ীয়েছিল তেমনি ষাটের দশকের শ্বায়ত্ব শাসনের আন্দোলনেও ছিল অগ্রনী ভূমিকা।

ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলনের ছাত্র সময়ে ছাত্রনেতা রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, গোলাম নেছার চৌধুরী, আব্দুল মতিন, আব্দুল গণি তরফদার, সুধেন্দু শেখর দেবরায় বাবুল, জয়নাল আবেদীন প্রমুখের নেতৃত্বে এখানে গড়ে উঠেছিল বিশাল ছাত্র আন্দোলন। তৎকালীন সময়ে মুসলিমলীগ রাজনীতির বাইরে বিরোধী রাজনীতির সংগঠন পরিচালনা ও অফিস ঘর ভাড়া পাওয়া  ছিল খুবই দুষ্কর কাজ। এই সংকটের সময়ে সাহসী আওয়ামীলীগ কর্মী মোঃ হুছন মিয়া ভানুগাছ বাজারের ১০নং গলিতে তার নির্মনাধীন  ঘরকে ব্যবহারের জন্য দিলে ভানুগাছ বাজারে চালু হয় আওয়ামী লীগের অফিস। বাবু পূর্ণেন্দু শেখর সেন দু’টাকায় ১টি পাটি কিনে  বসার ব্যবস্থা করে দেন  দলীয় কর্মীদের। অফিস স্থাপনের পর  আন্দোলন সংগ্রাম আরও বেগবান হয়ে উঠে।

১৯৭০ এর নির্বাচনের পরপর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষনের প্রেক্ষিতে এখানে গঠিত হয় সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি। কবি নওয়াব উদ্দিন আহমদকে আহবায়ক করে গঠিত উক্ত সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন, সৈয়দ মতিউর রহমান, মোহাম্মদ আলী, ফারুক উদ্দিন আহমেদ, শ্যামা দাস দত্ত, আফতাব মিয়া, রিয়াজ উদ্দিন, রফিকুর রহমান, সৈয়দ মখলিছুর রহমান, এম,এ, শহীদ, আব্দুল মতলিব তরফদার, এলাইছ মিয়া,  সিরাজুল ইসলাম,  আব্দুল মতিন তরফদার, তজমুল বক্ত, রহমত আলী, সুবোধ দেব, ভুরু মিয়া, আতাউর রহমান  প্রমুখ।
তখন জয়নাল আবেদীনকে আহবায়ক করে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কমিটির অন্যান্যদের মধ্যে যাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল তারা হলেন, মোঃ ছিদ্দেক আলী, প্রসন্ন দত্ত, মোঃ সাইফুদ্দিন, বিধান চন্দ্র দাস, ভূপতি রঞ্জন দেব চৌধুরী, জ্যোতির্ময় দেব, মিহির দেব, রানা দত্ত, শুধেন্দু শেখর দেবরায় বাবুল, আশিক মিয়া, এরফান মিয়া, আব্দুল মতলিব তরফদার, আব্দুল রফিক তরফদার, শওকত আহমদ, আজাদুর রহমান,  আশীষ কুমার দাশ, আঃ খালিক, আব্দুর রহমান, আব্দুল মান্নান, সামসুজ্জামান চৌধুরী, সৈয়দ বজলুল করিম, আব্দুল আজিজ,  রেজাউল করিম, মবশ্বির আলী, আনন্দ মোহন সিংহ, এম,মুকিত খান, মৃগেন কান্তি দাস চৌধূরী, বাপ্পী সিংহ, আনন্দ মোহন সিংহ, পীতাম্বর সিংহ, সালেহা বেগম, সুচেতা দেবরায় বেবী, বাসন্তী সিনহা প্রমুখ। এই সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে একটি মশাল মিছিল ভানুগাছ বাজার  প্রদক্ষিণ কালে তদানিন্তন এক প্রভাবশালী মুসলিমলীগ নেতার লেলিয়ে দেওয়া গুন্ডা বাহিনী মিছিলে আক্রমণ করলে তারা তা প্রতিহত করেন অসীম সাহসিকাতায়। শুধু তাই নয়, এই হামলার প্রতিবাদে পরদিন ভানুগাছ সাবরেজিষ্ট্রি মাঠে একটি প্রতিবাদ সভাও করেন তারা। মোঃ জয়নাল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্টিত এই সভায় তৎকালীন পাকিস্তান গন পরিষদ সদস্য সর্বজনাব আলতাফুর রহমানও বক্তব্য রেখেছিলেন। দেশব্যাপী প্রতিরোধ দিবস পালন কর্মসূচির অংশ হিসাবে ৭১সালের ২৩ শে মার্চ সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ  এই সাবরেজিষ্ট্রি মাঠেই পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন বিনা বাধায়। একই দিনে শমসেরনগরের পুলিশ ফাড়ির পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্রনেতা আব্দুর রহিম দুধু, সৈয়দ নজমুল ইসলাম লুকু ও সত্যেন্দ্র্র দেবনাথ নারায়ন। পাকিস্থানী পতাকা পুড়ানোর দায়ে ২৫ শে মাচ পুলিশ গ্রেফতারও করেছিল ছাত্রনেতা  আব্দুর রহিম দুধ ও সত্যেন্দ্র্র দেবনাথ নারায়নকে।

এদিকে ২৫শে মার্চ ঢাকায় গনহত্যার খবর পেয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে উপজেলাবাসী। মিছিল সহকারে হাজার হাজার মানুষ “সংহতিতে লাথি মারো পূর্ব বাংলা কায়েম করো” শ্লোগান দিতে দিতে ভানুগাছ বাজার ও শমসেরনগর বিক্ষোভ  মিছিল করেন। এই সময়টিতে নকশাল পন্থীদের হামলার মিথ্যা অজুহাতে ফোর্থ ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর খালেদ মোশাররফকে তার বাহিনীসহ কমলগঞ্জে পাঠানো হয়। তখন মৌলভীবাজারে অবস্থান করছিল ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সৈন্যরা। ২৬ শে মার্চ দেশব্যাপী কার্ফ্যু জারী হলে পাক ক্যাপ্টেন গোলাম রসুলের নেতৃত্বে পাকবাহিনীর একটি সামরিক যান  কমলগঞ্জের শমসেরনগর ও ভানুগাছে টহলে দিতে আসলে মেজর খালেদ মোশাররফ আচ করতে পারলেন আসলে তাকে পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন। তাই তিনি ঐদিনই পাকবাহিনীর সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে জনতার কাতারে সামিল হন  এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়ে ব্রাম্মনবাড়ীয়া অভিমুখে রওয়ানা দেন। পরদিনই কমলগঞ্জে মুক্তি পাগল জনতার এক বিরাট সমাবেশে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা পরিষদ। মুক্তিযোদ্ধের প্রতি অনুগত ৬০ জনের একটি দল তৈরী করে শমশেরনগর বিমান ঘাটিতে শুরু হয় ট্রোনিং এর কাজ । এর পর থেকেই সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি হিসাবে নিয়মিত চলতে থাকে দলে দলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ।

২৭শে মার্চ বিকেলে হানাদাররা টহলে এসে শমসের নগরে বিক্ষুদ্ধ জনতার মিছিলের উপর অতর্কিতে গুলি চালালে প্রাণ হারান সিরাজুল ইসলাম নামে এক বাঙালী। এ হত্যা কান্ডের প্রতিবাদে স্থানীয় বাঙ্গালী ই,পি,আর ও পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরাও একাত্মতা ঘোষনা করে সংগ্রাম পরিষদের সাথে।একই দিনে হানাদাররা ভানুগাছে টহলে এসে গুলি করে হত্যা করে আরও নিরীহ ৩ বাঙালীকে।

বর্বর হানাদার কর্তৃক এ দুটি  হত্যাকান্ডের খবর পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়ে উপজেলাবাসী। ২৮ শে মার্চ ভোর হতেনা হতেই আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ তীর-ধনুক, লাঠি-সোটা, বল্লম, দা-বন্দুক যার যা আছে তা নিয়ে ভানুগাছ বাজারে সমবেত হন প্রতিবাদ জানানোর জন্য। হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘ বিক্ষোভ মিছিলটি ভানুগাছ বাজার প্রদক্ষিন শেষে ধলাই নদীর ব্রীজটি অতিক্রম করতে গেলে কমলগঞ্জ ডাকবাংলোর সামনে অবস্থান নেওয়া পাকসেনারা মিছিলে বাধা প্রদান করে। কিন্তুু এতে সফলকাম না হওয়ায়  পাকসেনারা ব্রীজের পূর্বপার্শ্বের রাস্তার দুপাশে পজিশন নিয়ে মিছিলের উপর গুলি ছুড়তে  শুরু করে। তখন পাঞ্জাবীদের গুলিতে আহত হয়েছিলেন কমলগঞ্জের রাজাকার মুক্ত টিলাগাও গ্রামের বাসিন্দা বাছির মিয়া। সেদিন গ্রামের সকলের সাথে তিনিও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। এই অঞ্চলের মানুষ সেদিনই প্রথম এজাতীয় গুলির মুখোমুখি হয়। এসময়ে অনবরত গুলির শব্দে আতংকিত জনতার অনেকেই আত্মরক্ষার্থে দ্রুত ধলাই নদী অতিক্রম করতে গিয়ে নদীতে পড়ে আহত হন। এসময় ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার হন মছব্বির বক্ত, আফতাব উদ্দিন ও বাসন মিয়া। গ্রেফতারকৃতদের গাড়ীতে তুলে পাকসেনারা শমসের নগর অভিমুখে রওয়ানা দেয়।

খবর পেয়ে সমশেরনগরের মুক্তিপাগল জনতা স্থানীয় বাঙালী ইপিআরদের সহায়তায় পাকবাহিনীকে প্রতিরোধের পরিকল্পনা করেন। উঠিয়ে আনা হয় শমশেরনগর পুশিল ফাঁড়ির সমস্ত অস্ত্র। বাজারের অমান উল্যার দালান, রেলওয়ে ষ্টেশন ও সাবেক পিআইএ অফিস এর দোতালায় মোট ৩টি এ্যমবুশ স্থাপন করা হয়। ব্যরিকেড স্থাপন করা হয় শমসেরনগর- মৌলভীবাজার ও শমসেরনগর-ভানুগাছ সড়কের কৌশলগত স্থান সমূহে। রাস্তার উপর ব্যারিকেড  থাকায়  পাকবাহিনী শমসের নগরে ঢুকতে না পেরে তারা গাড়ী থেকে নেমে ব্যারিকেড অপসারনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঠিক সেই মুহুর্তে  দোতালা ভবনের ছাদ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা অতর্কিতে আক্রমনে চালালে পাকসেনার সন্ত্রস্থ হয়ে পড়ে ।  পাল্টা গুলি চালায় পাকসেনারা। দীর্ঘক্ষণ উভয়পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময়ের পর ঘটনাস্থলেই পাক ক্যাপ্টেন গোলাম রসুলসহ তার ৭ সহযোগী নিহত হয়। এবং পলায়নরত ২ পাকসেনাকে আটক করে হত্যা করেন বিক্ষুদ্ধ জনতা। মুক্ত হয়ে আসেন ভানুগাছ থেকে আটককৃত ৩ জন বাঙালী বন্দী। এ সংঘর্ষে কয়েকজন বাঙালী জনতাও আহত হন। এ যুদ্ধের পর বহু অস্ত্র শস্ত্র সহ হানাদারদের ব্যবহৃত গাড়িগুলো মুক্তিসেনাদের হস্তগত হয়।

৭১সালের ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষনার মাত্র ২ দিনের মধ্যে স্থানীয়ভাবে কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর এলাকার মুক্তিপাগল বাঙালীদের সম্মিলিত আক্রমনের মুখে পাকসেনাদের পরাস্ত ও হত্যা করার ঘটনা সারাদেশের মধ্যে প্রথম। আর একারনেই কমলগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। শমসেরনগর ছাড়াও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘঠিত যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নি¤েœ তুলে ধরা হলোঃ

ডেবলছড়া অপারেশন
জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধার ডেবলছড়া অপারেশনের পরিকল্পনা নেন। তখন শমসেরনগর থেকে ডেবলছড়া পর্যন্ত রাস্তায় পাকিস্তানী সেনাদের টহল চলতো। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী জুলাই মাসের এক দুর্যোগপূর্ণ রাতে মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে ৩০/৩৫ জনের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পায়ে হেটে কৈলাশহর থেকে ডেবলছড়া সংলগ্ন মুর্ত্তিছড়া চাবাগানে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। প্রায় ২ঘন্টা পর ৩ জন পাকিস্থানী সৈন্য কয়েকজন রাজাকারকে সঙ্গে নিয়ে একটি ট্রাক্টর যোগে শমসের নগর থেকে এখানে আসে। সঙ্গে ছিল তাদের ২০ বস্তা  চাল ও আটা এবং ৪/৫ জন শ্রমিক। তাদের অবস্থান এবং অস্ত্রের আওতায় আসার পর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণপণ আক্রমনের মুখে পাক সেনারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এই এলাকা মুক্ত হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্থানে অপারেশন পরিচালনা ও যাতায়াত সহজ হয়ে যায়।

শোনছড়া অপারেশন
ভানুগাছ বাজার থেকে প্রায় ৫ মাইল উত্তর-পূর্বদিকে শোনছড়া চা বাগানের অবস্থান। পার্শ্ববর্তী আলীনগর চাবাগানস্থ সেনা ছাউনী থেকে এসে এখানে টহল দিত পাকবাহিনী এবং এগিয়ে যেত সীমান্ত চৌকি পর্যন্ত। এই টহলদার পাকসেনাদের উপর আক্রমনের একটি পরিকল্পনা তৈরী করেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন হামিদ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী  নির্দ্দিষ্ট দিন রাতে কৈলাশহর থেকে মোজাফফর আহমেদের নেতৃত্বে ৪০ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধাদল অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে রওয়ানা দেন শোনছড়া অভিমুখে। অন্ধকার ভেদ করে রাত ৩টায় তারা পৌছেন গন্তব্যে। দলনেতার নির্দেশে শোনছড়াÑআলীনগর রাস্তায় শক্তিশালী মাইন পোতার পর ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নেন চাবাগানের ভিতর। অতঃপর অপেক্ষার পালা। একসময় অন্ধকার মিলিয়ে গিয়ে আলোর আভা উঠে চরাচরে। আর তখনই জলপাই রঙের একটি জীপ নিয়ে আলীনগরের দিক থেকে পাকসেনারা টহলে আসতে দেখা যায়। দেখতে দেখতে এক সময় ফাদে পা ফেলে পাক সামরিক যান। প্রচন্ড শব্দে মাইন বিস্ফোরনে বিধ্বস্ত হয় গাড়িটি। শুরু হয় দু’পক্ষের মধ্যে। এই যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা জানা না গেলেও এর মধ্য থেকে সফলতার সাথে বের হয়ে এসেছিলেন আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা ।

শমসেরনগর চাবাগানে অপারেশন
অক্টোবর মাসের শেষভাগে মুক্তিযোদ্ধারা শমসেরনগর চা বাগানে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন। এখানে ছিল পাকবাহিনীর শক্তিশালী অবস্থান। পাকবাহিনীর রসদ পরিবহনের জন্য এখানে  গাড়ী জমা রাখা হতো। ২৫ অক্টোবর রাতে লেঃ কর্ণেল আলী ওয়াকিউজ্জামানের নেতৃত্বে ২০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল পাহাড়ী জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হাটতে হাটতে রাত আড়াইটায় চা বাগানে প্রবেশ করে। দলটি ২ভাগে বিভক্ত হয়ে একটি দল প্রবেশ করে চা বাগানের কারখানায় এবং অপর দলটি  পাকবাহিনীর আক্রমন প্রতিহত করতে অবস্থান নেয় সুবিধাজনক অপর এক স্থানে। রাত ৪টায় বিস্ফোরক দিয়ে ফ্যাক্টরীর জেনারেটর ও গাড়ীগুলো ধ্বংশ করে দিতে সমর্থ হন তারা। বিস্ফোরনের বেশ কিছুক্ষন পর পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি চললেও মুক্তিযোদ্ধারা সকলেই কোনরুপ ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই নিজ ক্যাম্পে ফিরে যেতে সক্ষম হন।

ধলই অপারেশন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ধলই অপারেশন একটি গুরুত্বপূর্ন ঐতিহাসিক ঘটনা। এদেশে পাকসেনাদের যে ক’টি দূর্ভেদ্য ঘাটি ছিল তন্মধ্যে কমলগঞ্জের ধলাই ছিল অন্যতম ঘাটি। এখান থেকে বড়লেখার লাতু পর্যন্ত প্রায় ৫০ মাইল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা হতো।  পাকবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার ইফতেখার আহমেদ রানা ছিলেন এই বিশাল এলাকার দায়িত্বে। সামরিক কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই সীমান্ত চৌকির দখল বজায় রাখার জন্য গোটা এলাকায় ২২ বালুচ ও ৩০ ফ্রন্টিয়ার্স ফোর্সকে মোতায়েন করার পাশাপাশি রিজার্ভ হিসাবে রাখা হয়েছিল আরও ১ ডিভিশন সৈন্য। আত্মরক্ষার জন্য কংক্রীট দিয়ে এখানে এমন ধরনের ব্যংকার তৈরী করা হয়েছিল যে, এর ভিতরে রসদ সরঞ্জামাদি প্রচুর পরিমানে রাখার কারনে সৈন্যদের বাইরে বের হওয়ার প্রয়োজন খুব একটা হতোনা। তবুও মুক্তিবাহিনীর অবিরাম  আক্রমনের মুখে পর পর ৪ বার এই সীমান্ত চৌকির দখল হস্তান্তরিত হয়েছিল। এসব যুদ্ধে বেশকিছু পাঞ্জাবী সৈন্যও মারা পড়েছিল। এই সীমান্ত চৌকি পরিদর্শনে জেনারেল নিয়াজীও তখন এখানে এসেছিলেন।

ধলাই সীমান্ত চৌকি থেকে দক্ষিণ পূর্বদিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর শহরে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সাব সেক্টর ক্যাম্প। আর তাই যুদ্ধকালীন বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এই ঘাটি আক্রমন ও দখলকরা ছিল অতীব জরুরী। গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অক্টোবরের গোড়ার দিকে  ক্যাপ্টেন মাহবুব একবার আঘাত হানলেও স্ব-পক্ষের বেশ কিছু আহত সৈনিককে নিয়ে তাকে ফিরে যেতে হয়েছিল। ২৭ শে অক্টোবর রাতেও ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন {বীরবিক্রম} ও সাজ্জাদুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর বিরাট এক দল প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শত্রুর উপর আঘাত হানলেও ঘন কুয়াশার কারনে তেমন একটা সুবিধা করে উঠতে পারেন নি।  ২৮ অক্টোবর ভোর হতেই  জেড ফোর্সের প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন মাহবুব, ক্যাপ্টেন নূর, ও ক্যাপ্টেন কাইয়ুম তাদের বাহিনী নিয়ে সাহায্যে এগিয়ে আসেন। তারা চতুর্দিক থেকে সাড়াশী আক্রমন চালান। মুক্তিবাহিনীর ব্যাপক গোলাবর্ষণে একসময় পাকক্যাম্পে আগুন ধরে যায়। হানাদাররা পাক শিবিরের আগুন নেভাতে ব্যস্ত থাকার সুযোগে শত্রু শিবিরের কাছে পৌছাতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরনে হতাহত হন বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা। অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানের নির্দেশ ক্ষয়ক্ষতি যতই হোক না কেন ধলই সীমান্ত চৌকি দখল করতে হবে। তাই হতাহতদের পিছনে রেখে মুক্তিযোদ্ধারা বীরবিক্রমে এগিয়ে গেলেন। কিন্ত দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে একজন পাকসেনা এমনভাবে এলএমজি দিয়ে গুলিবর্ষন করছিল যে, কাছাকাছি পৌছেও শিবির দখল করা তো দূরের কথা সুবিধামতো অবস্থানটাও নিতে পারছিলেন না মুক্তিযোদ্ধারা। তাই ক্যাপ্টেন কাইয়ুম শত্রুপক্ষের এলএমজিটি নিষ্ক্রিয় করার দায়িত্ব দিলেন সহযোদ্ধা হামিদুর রহমানের উপর। এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে দেশেপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ সৈনিক হামিদুর রহমান উভয় পক্ষের বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির মধ্যে চাবাগানের ভিতর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে একটি মাত্র হালকা মেশিনগান নিয়ে  শত্রুর ৫০ গজের ভিতর ঢুকে পড়লেন। সমরাস্ত্রটিকে স্তব্দ করতে অসীম সাহসের সাথে তিনি মুখোমুখি হলেন শত্রু সৈন্যের। তার মেশিনগানের গুলিতে শত্রুদলের অধিনায়ক এবং অপর কয়েকজন সৈন্য প্রাণ হারায়। এমন সময় শত্রু সৈন্যের একটি বুলেট হামিদুরের কপালে আঘাত করে। দেশের স্বাধীনতার মহান সৈনিক ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। হামিদুর রহমানের জীবনের বিনিময়ে হানাদারদের হঠিয়ে ধলই দখল করতে সক্ষম হন মুক্তিযোদ্ধারা। ধলই যুদ্ধে শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জাতী তাকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধীতে ভূষিত করেছে।

পাত্রখোলা অপারেশন
যুদ্ধকালীন সময়ে কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা সীমান্ত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতো। মুক্তিবাহিনীর প্রবেশ রোধ করতে এপ্রিল মাসে মেজর ঘটকের নেতৃত্বে এক কোম্পানী পাকসেনা সেখানে অবস্থান নেয়। এসময় মুক্তিযোদ্ধাদের কমলপুর সাব-সেক্টরের দ্বায়িত্বে নিয়োজিত প্রাক্তন মোজাহিদ ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমান পাত্রখোলা আক্রমনের পরিকল্পনা করেন। সে অনুযায়ী বেশ ক’বার আক্রমন করেও সফলতা না পাওয়ায় অবশেষে ২৯ অক্টোবর রাতে ক্যাপ্টেন কাইয়ুমের নেতৃত্বে নিয়মিত বাহিনী ও সাজ্জাদুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী মিলিয়ে ৩১ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল পাত্রখোলা চা বাগানের পাক হানাদারদের ছাউনী থেকে প্রায় প্রায় ৩ মাইল পূর্বদিকে রাস্তার পার্শ্বে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে এ্যামবুশ করে রাত ৩ টার পর টহলরত পাক সেনাদের উপর আক্রমন চালান। উভয় পক্ষের গোলাগুলিতে পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রান হারান বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম। প্রথমদিকে মুক্তিযোদ্ধারা সুবিধা করতে না পারলেও টানা ৫দিন যুদ্ধের পর ২রা নভেম্বর তারিখে পাক বাহিনী আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়।

কামোদপুর অপারেশন
৪নং সেক্টরের সদর দপ্তর থেকে মৌলভীবাজার-শমসেরনগর ও শমসেরনগর-ভানুগাছ সড়কের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার দ্বায়িত্ব দেওয়া হয় লেঃ ওয়াকিউজ্জামানের উপর। নির্দেশ অনুযায়ী তিনি ২৮ শে নভেম্বর রাতে ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে শমসেরনগর ভানুগাছ সড়কের কামোদপুর এলাকার একটি বড় দীঘির পাশে অবস্থান নেন। শুরু হয় অপেক্ষার পালা। সকাল ৯ টার দিকে একটি সামরিক ট্রাক যোগে শমসেরনগর থেকে ভানুগাছের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। কাছাকাছি আসামাত্র মুক্তিযোদ্ধারা মেশিনগান ও মর্টার দিয়ে অবিরাম গোলাবর্ষণকালে ৬ জন পাকসেনা নিহত হয় ও ট্রাকটি ধ্বংশ হয়। জীবিত পাকসেনারা পালিয়ে যায়। ঘটনার প্রায় ২ ঘন্টা পর শমসেরনগর থেকে ২০জন পাকসেনা রেলপথ দিয়ে হেটে কামোদপুর এলাকায় এলে মুক্তিযোদ্ধারা আবারও আক্রমন চালান। শুরু হয় প্রচন্ড যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের গোলা-বারুদ ফুরিয়ে আসায় সন্ধ্যার পর তারা ফিরে যান ভারতীয় ক্যাম্পে। এ যুদ্ধে ৭জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং আহত হন ৪ জন।

শমসেরনগর বিমানবন্দর অপারেশন
বিমানযোগে পাকসেনারা তখন শমসেরনর বিমানবন্দরে নামতো। বলা যায়, এ বিমান বন্দরকে  ঘিরেই এতদাঞ্চলে গড়ে উঠেছিল তাদের শক্ত ঘাটি। এখানে ঘাটি গাড়বার পর থেকেই তারা নতুন করে শক্তি  সঞ্চয় করতে থাকে। এর আগে মুক্তি বাহিনীর  হাতে মার খাওয়ার প্রতিশোধ নিতে পাল্টা আক্রমনের প্রস্তুতি নিতে থাকে তারা। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। তার আগেই মুক্তিবাহিনী আক্রমন করে বসে তাদের উপর। ইপিআর এর ৩নং উইংয়ের সুবেদার শামসুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের এক বিশাল দল এই অক্রমনে অংশ নেন। পাল্টা আক্রমন চালিয়েও বেশীক্ষন টিকে থাকতে পারেনি পাকবাহিনী। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে তারা পালিয়ে যায় বিমান বন্দর ছেড়ে। প্রথম দিনেই মুক্ত হয় শমসের নগর বিমানবন্দর। তবে এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

মুন্সীবাজার অপারেশন
যুদ্ধকালীন সময়ে মৌলভীবাজার-মুন্সীবাজার-শমসেরনগর সড়কটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এই সড়কটিকে নিরাপদ রাখতে ১জন মেজরের নেতৃত্বে ১কোম্পানী পাকসেনাকে তখন মুন্সীবাজার এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছিল। তখন মুক্তাঞ্চল হিসাবে বিবেচিত শমসেরনগর এলাকায় অবস্থান করতেন প্রায় ৪শ মুক্তিযোদ্ধা। ৪ঠা ডিসেম্বর গভীর রাতে ক্যাপ্টেন আব্দুল আহাদ চৌধুরীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা মুন্সীবাজার এলাকায় পৌছে  ৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে পাক সেনাদের ক্যাম্পে অতর্কিতে আক্রমন চালান। প্রায় ৫ ঘন্টাব্যাপী এই যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় আতংকিত হয়ে পাক সেনারা পালিয়ে যায়। পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে ৩ জন পাকসেনা। এযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ হতাহত হননি। যুদ্ধের পর পাকসেনাদের ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমান অস্ত্র ও গোলাবারুদ মুক্তিবাহিনীর হস্তগত হয় এবং হানাদার মুক্ত হয় মুন্সীবাজর এলাকা।

ভানুগাছ অপারেশন
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ভানুগাছের যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন। ২৯ নভেম্বর তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান ভানুগাছ দখল করে শ্রীমঙ্গল হয়ে সিলেটের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী অষ্টম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের লেঃ ওয়ালী ও লেঃ মাহবুবের নেতৃত্বে  মুক্তিযোদ্ধারা ভানুগাছের সন্নিকটে ধলাইনদীর পূর্বতীরে ধলাইব্রীজ সংলগ্ন এলাকায়  অবস্থান নেন।  ব্রীজের ডানপার্শ্বে ছিল পাকিস্তানী মেশিনগানের পজিশান। নদীর ডানদিকের পানি গভীর হলেও বামদিক ছিল অগভীর। নদী অতিক্রম করে বামদিকে শ্রীমঙ্গল সড়কের কোল্ড স্টোরেজ এর সামনে ছিল পাকসেনাদের ক্যাম্প। যুদ্ধকালীন সময়ে ষ্টেশন রোডের এমএলএ কেরামত আলীর প্রসাদোদ্যম ভবনটি ব্যবহৃত হতো এতদাঞ্চলের পাকবাহিনীর সদর দফতর হিসাবে। আর তাই ভানুগাছ অপারেশন কৌশলগত দিক থেকে যেমন ছিল গুরুত্বপূর্ণ তেমনি ছিল অনেকটাই ঝুকিপূর্ণ। তবুও অসীম সাহসে মুক্তিযোদ্ধারা ২রা ডিসেম্বর তারিখে ভানুগাছ আক্রমন করেন। কিন্তু ধলাই ব্রীজের পার্শ্বের পাকসেনাদের অবস্থান থেকে অবিরাম মেশিনগানের গুলিবর্ষনের কারনে ঐদিন ভানুগাছ দখল করা সম্ভব হয়নি।

৩রা ডিসেম্বর লেঃ ওয়ালী রকেট ল্যঞ্চারের মাধ্যমে মেশিনগানের পজিশন ধ্বংশ করে দেওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসেন। ৪ঠা ডিসেম্বর নদী পেরিয়ে পুনরায় পাকসেনাদের অবস্থানের উপর চতুর্দিক থেকে সাড়াশী আক্রমন চালানো হয়। প্রচন্ড আক্রমনের মুখে পাকসেনারা পরাজয় বরন করতে বাধ্য হয়। শত্রুমুক্ত হয় ভানুগাছ এলাকা। টানা ৩দিনের এই যুদ্ধে  ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৪ জন সৈনিকসহ মোট ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং আহত হন আরও অনেকে। ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য এই ৪ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সমাহিত করা হয়েছে কামুদপুরের একটি দীঘির পাড়ে।

এছাড়াও আদিয়া, কুরমা, চাম্পারায়, কাটাবিল, চৈত্রঘাট ও পালপুর সহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আরও বেশ ক’টি সফল অপারেশন চালিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। এখানকার বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন বঙ্গ বীর এম,এ জি ওসমানী, বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ, বিগ্রেডিয়ার আমিন আহম্মদ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মত দেশ বরেণ্য ব্যক্তিরা। এ উপজেলার বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, লেন্স নায়েক জিল¬ুর রহমান, সিপাহী মিজানুর রহমান, সিপাহী আব্দুর রশিদ, সিপাহী শাহাজাহান মিয়া সহ নাম না জানা অনেকেই।

একাধারে ৯ মাস ব্যাপী চলমান এই মুক্তিযুদ্ধে ক্যাপ্টেন মোজাফরর আহমেদে, ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমান,  মিহির চন্দ্র দেব এম,এ গফুর, ময়না মিয়া, হাজী আব্দুল মন্নান, আব্দুল বাছিত, ময়না মিয়া, অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরী প্রমুখের নেতৃত্বে কমলগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা যে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন তা এ এলাকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এ এলাকার সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালিত বিভিন্ন গেরিলা অপারেশনের লোমহর্ষকর পর্যায়গুলো শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না বি,বি,সি, ভয়েস অব আমেরিকা সহ বিভিন্ন বেতার মাধ্যম থেকে তার উপর মন্তব্যও করা হয়েছে বহু বার। সামনে থেকে নেতৃত্ব দানকারী কমলগঞ্জের আরেক অগ্রসেনানী ছিলেন সৈয়দ মতিউর রহমান। শমশেরনগর মুক্ত হবার প্রাক্কালে তার অসীম সাহসী যুদ্ধ পরিচালনা দেখে চমৎকৃত হয়েছিলেন শমশেরনগর ডাক বাংলোয় অবস্থানকারী তৎকালীন সময়ের মিত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন চাতওয়াল সিং।
অতঃপর ৫ই ডিম্বের উপজেলার দেওরাছড়া, নারাইনপুর, কালাছড়া, সরইবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত পাকসেনারা কোনরুপ যুদ্ধ ছাড়াই পালিয়ে গেলে গোটা কমলগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়।

স্বাধীনতাযুদ্ধ কালীন সময়ে পাকহানাদররা তাদের এদেশীয় দোসরদের সহায়তায় গোটা কমলগঞ্জ জুড়ে চালিয়েছিল নির্বিচারে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ। বিভিন্ন গ্রাম থেকে সাধারণ মানুষদের ধরে এনে শমশেরনগর ডাক বাংলোর সামনের বট গাছে হাত পা বেধে ঝুলিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালাতো। নির্যাতন শেষে শমশেরনগর বিমান বন্দর রানওয়ের উত্তর পূর্ব কোনে বধ্য ভূমিতে হাত পা চোখ বেঁধে পাখীর মতো গুলি করে হত্যা করতো। হিংস্র জন্তুুর মাংস খাবলে খাওয়ার মতো হায়েনারা লাশের উপরও চালাতো বেপরোয়া বেয়নেট! কখনো লাশের উপর লাশ রেখেও মাটি চাঁপা দেওয়া হতো। এ বধ্যভুমিতে শুধু কমলগঞ্জের হতভাগ্য মানুষেরই লাশ ছিলনা বহূ দুর-দুরান্ত থেকে ক্ষুধার্ত হায়েনারূপী পাক সেনাদের নির্দেশ অসংখ্য নারী-পুরুষকেও এখানে এনে জীবন্ত কবর  দেয় হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে দুঃসহ এই বটগাছটি এখনও বিদ্যমান আছে। শুধু শমসেরনগর বিমানবন্দর রানওয়েই নয় এ উপজেলার পাত্রখোলা, আদিয়া, চৈত্রঘাট ও দেওরাছড়া বধ্যভূমিতেও হানাদারদের গুলিতে জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে কমলগঞ্জের অগুনিত নিরপরাধ লোককে।

১ম দফায় পাকবাহিনীর এ নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হন কৃষ্ণপুরের আব্দুল গনি, আব্দুল আলী ও আব্দুর নূর, শিংরাউলীর আমজদ আলী, ভরতপুরের আরজু মিয়া ও হুরমত আলী, রাধানগরের পাখী মালাকার, বিজয় মালাকার ও আবুল কাশেম, সারংপুরের বারিক মিয়া ও হানিফ মিয়া, সোনাপুরের প্রতাপ পাল ও পীযুশ পাল,  ভানুগাছের কৃষ্ণ পদ দত্ত ও প্রসন্ন দত্ত, বড়গাছের মছদ্দর আলী, চন্ডিপুরের আজিজ মিয়া, গোকুল নগরের বেঙ্গল রেজিমেন্ট সদস্য ময়না মিয়া, সোনাপুরের মবশ্বির আলী, আলীনগর চা বাগানের নীরোদ নাগ, মিছিরিয়া নুনিয়া, গগন নুনিয়া ও ঈন্দ্রজিৎ নুনিয়া প্রমুখ।

এরপর হানাদাররা রাজাকার সোনা উল্যার পরামর্শে হানা দেয় দেওরাছড়া চা-বাগানে। শ্রমিক বস্তিতে  ঢুকে ৭০ জন শ্রমিককে ধরে এনে অস্ত্রের মুখে ভাইয়ের সম্মুখে  ভাই, পুত্রের সম্মুুখে পিতাকে বিবস্ত্র করে তাদের পরিধেয় কাপড় দিয়ে প্রত্যেকের হাত বেধে এক সারিতে দাড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এর মধ্যে ১২ জন শ্রমিক মৃত্যুর সাথে পাঞ্জালড়ে ভাগ্য ক্রমে বেচে যান। যারা প্রান হারিয়েছেন তারা হলেন শহীদ উমেশ শবর, লক্ষীচরন শবর, হেমলাল কর্মকার, রসিক কর্মকার, বাবুলাল কর্মকার, অকুল রায় ঘটুয়ার, ধনিয়া ঘটুয়ার, সোনারাম গোয়ালা, জহন গোয়ালা, অনিল গোয়ালা, লক্ষণ মুড়া, রঘু মুড়া, বিনোদ নায়েক, প্রহল্লাদ নায়েক, বিশ্বনাথ ভূইয়া, সাবজান ভূইয়া, বাবুরাম ভুইয়া, ভুবন কানু,  ভাদো ভূইয়া, আগলু ভূইয়া, হরেন্দ্র কানু, কুরুয়া কানু, তারাপদ ভূমিজ, নারায়ন ভূমিজ, গোবর্ধন ভূমিজ, বিজয় ভৌমিক, মংরু বড়াইক, মধু বড়াইক, বধুয়া কুর্মী, লক্ষীচরন কুর্মী, লটু কুর্মী,  বররাম উরাং, মংরু উরাং, দুর্গাচরন তেলেঙ্গা, গাঙ্গানা তেলেঙ্গা, বন্ধু সম্ভু, শ্রীধর মাল, রামকিশোন উপাধ্যান, গোপাল বৈদ্য, গোলক নারায়ন মুদি, গগন মৃধা, গুরুদাস, রবিদাস, কনক রাজ তাতী,  শ্রীপঞ্চ রৌতিয়া। অন্যান্যদের নাম জানা যায়নি।

১৭মে রাতের আধাধারে  শ্রীসূর্য্য, পতন উষার, মনসুরপুর ও পলকির পার গ্রামে হানা দিয়ে পাকবাহিনী হত্যাকরে কমলগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমেশ চন্দ্র দাস, ব্যাবসায়ী যোগেশ চন্দ্র দাস, আব্দুল করিম, আক্তার আলী, আপ্তাব আলী, কৃপেশ চন্দ্র দত্ত,  ডা: ছওয়াবব আলী ও আব্দুস শহীদকে।

২৭ মে কুখ্যাত দালার ছোরাব আলী, ছৈদ উল্যা ও শাহবাজ উদ্দিনের নেতৃত্বে পাক হানাদারারা চৈত্রঘাট, পার্বতীপুর ও লক্ষীপুর গ্রামে আক্রমন চালিয়ে হত্যা করে ইরেশ রাল দত্ত, যতীন্দ্র মোহন দত্ত, মন্মথ দত্ত,  রাম কুমার দেব, ডাঃ আব্দুর রশিদ, নরেন্দ্র কুমার দেব, নৃপেন্দ্র কুমার দেব, সুখময় দেব ও খোকা দেবকে। তখন হানাদারদের হত্যাযজ্ঞের শিকার হন আদমপুরের আওয়ামী লীগ নেতা হাজির খান ও আদিয়া চাবাগানের টিলাবাবু  ওয়াজিদ আলী খান আরও ২ জন ব্যক্তি।

১২ আগষ্ট দেশীয় কুলাঙ্গারদের প্ররোচনায়  হানাদারা কমলগঞ্জের আদিবাসী গ্রাম ভানুবিল, মঙ্গলপুর, ফুলতলি ও হোমেরজান গ্রামে প্রবেশ করে তমাল সিংহ, মদন সিংহ, চিত্ত সিংহ ও সার্বভৌম শর্ম্মা সহ ১৪ জন আদিবাসী মনিপুরিকে ধরে এনে গুলিকরে হত্যা করে। আর ভারতে যাওয়ার পথে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে প্রাণ হারান মঙ্গলপুর গ্রামের খাম্বা সিংহ ও উত্তর পলকির পরা গ্রামের  আরজু মিয়া।  এছাড়া মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে  মাইন বিস্ফোরনে নিহত হন কৃষ্ণপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজ। সদা হাস্যোজ্জল এই তরুন মুক্তিযোদ্ধার কথা মনে করে গ্রামবাসীদের অনেকেই বেদনায় ভেঙে পড়েন।

হায়েনাদের কবল থেকে রেহাই পায়নি কমলগঞ্জের নারীরাও। অসংখ্য মা-বোনকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে হানানাদর বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে। এদের অনেকেই আজ আর বেচে নেই। তাদের মধ্যে আরিনা বেগম ও প্রভাসিনী মালাকার নামে যে দু’জন বীরাঙ্গনা নারী কালের শাক্ষী হয়ে আজও বেচে আছেন স্বাধীনতার চার দশক পেরিয়ে গেলেও তাদের ভাগ্যে জুটেনি সরকারী স্বীকৃতিটুকু।  জীবন সায়াহ্নে স্বীকৃতির জন্য তাদের করুন আর্তি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তি বিেেবককে একটুও নাড়া দিতে পারেনি। জাতী এ লজ্জা ঢাকবে কি দিয়ে ?

শুধু বীরাঙ্গনারাই নয় যে স্থান গুলোরর মাটির সাথে  মিশে আছে আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা, বীরত্ব, আত্মত্যাগ, বেদনা ও গৌরবের ইতিহাস সেগুলোও এখন পর্যন্ত অবহেলিত। দীর্ঘদিনের অযতœ আর অবহেলায় লোক চক্ষুর আড়ালে পড়ে থাকা এই বধ্য ভূমি গুলোও এখন ঝোপ জঙ্গলে  আচ্ছাদিত। উপজেলাবাসীর দাবীর প্রেক্ষিতে  সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার বধ্যভূমির স্থানগুলোকে চিহ্নিত করনের জন্য জরিপকার্য্য পরিচালিত হলেও শুধুমাত্র শমসেরনগর বধ্যভূমি ব্যতিত অন্যান্য স্থানসমূহ সংরক্ষনের কোন উদ্যোগ গ্রহন করেনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। অথছ এটা করা দরকার।  বিশ্বজিৎ রায়, সাংবাদিক, কলাম লেখক, সাবেক সভাপতি  কমলগঞ্জ প্রেসক্লাব।

তথ্যসূত্র
সিলেটে গণহত্যা-তাজুল মোহাম্মদ, লক্ষপ্রাণের বিনিময়ে-মেজর {অবঃ} রফিকুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধে উত্তর পূর্ব রনাঙ্গন-মেজর [অব} কে এম শফিউল্লাহ,  জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে মৌলভীবাজার-সরওয়ার আহমদ, কমলগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের কথা-সুব্রত দেবরায় সঞ্জয়, বিকিরন-মীর লিয়াকত আলী ।

দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক দেশবাংলা, দৈনিক যুগভেরী, দৈনিক  আজকের কাগজ, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, দৈনিক সংবাদ , সাপ্তাহিক মনুবার্তা সহ অন্যান্য সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ।

কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ১০.১২.১৪

বাংলাদেশনিউজ
১০.১২.২০১৪


Comments are closed.