>> সিলেট শিবপুরে জঙ্গী বিরোধী অভিযান চলছে গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে >> নারায়ণগঞ্জে পিকআপভ্যানের চাপায় পুলিশ কনস্টেবল নিহত >> ভারতের মনিপুরে বাস দুর্ঘটনায় নিহত ১০ আহত ২৫

ছোটগল্প : নির্বাচন

মুনশি আলিম

Munshi Alim 1

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 
এক
– এরে আইয়ো খালকে শ্রীপুর ফার্কো যাই?
– মনো অয় ফারতাম নায়
– খেনে?
– আববা গরো আছইন
– তো খিতা অইছে?
– তুমি ইতা বুঝতায় নাই… খালি নিজরটা ষোল আনা বুঝ!
– কলেজর কতা কইয়া আউনা খেনে?
– যদি দরা ফরি যাই…?
– তুমি রে গো খালি দেরিয়া ছিন্তা খর? অততা ছিন্তা খরিয়া ছলত নায়? তুমি খালকে আইবায় অখান শেষ কতা; কিলান আইবায় ইখান তুমি তোমার বুঝ?
– নিরুত্তর।
– বুজছ নি?
– না আইলে অয় নাই নি?
– আমারে যদি হাছাও বালা ফাও তবে যেলান অয় খালকে তুমি বেলা দুইটার সময় আইবায়। রাকি দিরাম। বালা থাকিয়ো।

অনিন্দিতাকে শেষ কথাটি বলেই লাইন কেটে দিল অনুপম।  বছর দুয়েক হল তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে। বলা যায় কলেজ জীবনের প্রথম দিক থেকেই তাদের পরিচয় এবং ধীরে ধীরে তা গভীর হয়। গত বছরই অনুপম অনার্স পাশ করেছে। রেজাল্টও বেশ ভাল। তবে নিজের মামা ও খালুর জোর না থাকায় কোথাও তার ভাল চাকরি হচ্ছে না। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাও যেন কেমন! আয়া-বুয়া থেকে শুরু করে একবারে সচিব পর্যন্ত সবকিছুতেই দলীয়করণ! একেবারে নগ্ন দলীয়করণ! আমাদের রাজনীতিতে প্রাগৈতিহাসিক ডায়াবেটিস, অর্থনীতিতে বিবর্ণ জন্ডিস- কিন্তু ভাবের ঘরে চিরায়ত ভালুক জ্বর! আমাদের রাজনীতিতে সুস্থধারা অব্যাহত থাকলে হয়ত খুব দ্রুতই রাষ্ট্র উন্নত দেশে পরিণত হতে পারত। অসুস্থ থাকার কারণে অনেক সোনার ছেলেমেয়েকেই রাজনীতির কাছে বলি হতে হয়। যেমনটি হচ্ছে অনুপম। কেবল চাকরি হচ্ছে না বলেই সে অনিন্দিতাকে ঘরে তুলতে পারছে না। যতই দিন গড়াচ্ছে ততই যেন তা আরও কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে ওঠছে।

অনুপম দেখতে বেশ সুদর্শন। পেশায় সে শিল্পী না হলেও গলার কণ্ঠস্বরও ভালো। এলাকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার বেশ কদর রয়েছে। এমনিতেই সে রাজনীতি করে না; কিন্তু রাজনীতি সচেতন। কাল যে নির্বাচন! আর নির্বাচনে যে কলেজ বন্ধ থাকে এ কি আর আজকালকের অভিভাবকরা বুঝে না! কী করে যে কাল অনিন্দিতা আসবে! অনিন্দিতাকে সে এতটা চাপ না দিলেও পারত-এমনি নানা ভাবনা তার মনের মধ্যে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। এমন সময় তার মামা অরিন্দম রুমে প্রবেশ করে। মধ্যবয়সী কিন্তু বেশ লম্বা চওরা গোছের। এবার তিনি চেয়ারম্যানি নির্বাচনে লড়ছেন। দীর্ঘদিন থেকে মামা অরিন্দমের সাথে তার পারিবারিক দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এতদিন নানাভাবে তার মামা তাদের পরিবারকে কোণঠাসা করে রেখেছিল। বিশেষ করে তার মাকে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করেছে।

আগামিকাল নিবাচন। কাজেই নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসন জরুরি। এই চিন্তা করেই বোধ করি তার মামা অরিন্দম এসে অনুপমকে জড়িয়ে ধরল। মিথ্যে আবেগ সৃষ্টি করে অনেক কাঁদলো। শেষটায় আশ্বাস দিল নির্বাচনে পাশ করতে পারলে তিন গুণ সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া হবে। মামার দরদভরা আবেগের কাছে গলে গেল অনুপম। বোধ করি সকল রাজনীতিবিদরাই নির্বাচনের আগে এমনি আশ্বাসের ফুরঝুরি ছড়ায়। ভোটের লোভে এ সময় নিকটাত্মীয়দের কাছে নত হতে দেশের সেরা রাজনীতিবিদরা পর্যন্ত দ্বিধাবোধ করেন না। অনুপম মামার হাত কোনভাবেই ছাড়তে পারলো না। মামাকে যে সে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেছে এবং তার যে এই মুহূর্ত থেকে মামার ওপর কোন রাগ কিংবা অভিমান নেই তারই প্রমাণস্বরূপ তাকে মামার সাথে নির্বাচনী প্রচারণায় বেরিয়ে যেতে হল।

দুই
পরের দিন। সকাল থেকেই মানুষ দলে দলে ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছে। কালো টাকার ছড়াছড়িও হচ্ছে বেশ। এ যেন এক অপেন সিক্রেট ব্যাপার! পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো অনিন্দিতা দুপুর হতেই পার্কে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার ছোট বোন অনামিকাই পার্কে যাওয়ার জন্য সব ব্যবস্থা পাকা করে দিয়েছে। বয়সে দুজনেই তারা প্রায় পিঠাপিঠি। এ কারণে সে শুধু বোনই নয়, বান্ধবী হিসেবেও সকল দায়িত্ব পালন করে থাকে।

অনিন্দিতা হাঁটছে। আঁকাবাঁকা মেঠো পথ। হেমন্তের আকাশ। বেশ ঝলমলে রোদ। নির্বাচনী হাওয়া বিরাজ করায় রাস্তাভর্তি মানুষ খোশগল্পে মেতে ওঠেছে। তবুও কে কোথায় যাচ্ছে কেউ একেবারে নিজস্ব মানুষ ছাড়া কিংবা নিতান্তই প্রয়োজন ছাড়া কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করছে না। ভোটকেন্দ্র থেকে ফিরলেই মনে করে ভোট দিয়ে এসেছে। সুতরাং তাকে নতুন করে জিজ্ঞেস করে নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করার মতো মনমানসিকতা গ্রামের একেবারে গণ্ড মূর্খটিও পর্যন্ত মনে করে না।

আজ অনিন্দিতা বেশ জমকালো পোশাক পড়েছে। তার দৈহিক গড়নও বেশ নান্দনিক। হেমন্তের মতোই সে উচ্ছল, প্রাণবন্ত। তার ডাগর চোখের চাহনির ভাঁজে খেলা করে অপূর্ব এক সৌন্দর্য। আরক্তিম ঠোঁটের ক্যানভাস জুড়ে লিপলাইনের দারুন কারুকাজ। গোলাপী চিবুকের নিরক্ষীয় অঞ্চল জুড়ে কী যে এক অপূর্ব সৌন্দর্যের মহিমা যেন জগৎবিখ্যাত পিথাগোরাসের জ্যামেতিক ক্যানভাসের সূক্ষ্ম কারুকাজ!

রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই সে একটু খোলামেলা চলাফেরা করত। তার বাবা যেমন এলাকার কাউকে তোয়াক্কা করে কথা বলে না তেমনি সেও কাউকে থোরাই কেয়ার করে। মনের ভেতর অফুরন্ত সুখের পরশা নিয়ে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে চা-বাগানের ভিতর দিয়ে হাঁটছে। বেশ ঘন জঙ্গল।

অদূরেই ৭ নাম্বার ভোট কেন্দ্র। এই ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় ভোটকেন্দ্র এটি। বড় বলে ঝুকিপূর্ণও বেশি। এমন কোন নির্বাচন নেই যে,  সে নির্বাচনে কোন প্রকার গণ্ডগোল হয় নি। এইকারণে প্রতিবছর এখানে নিরাপত্তাকর্মীও বেশি দেওয়া হয়। নিরাপত্তাকর্মী বেশি দিলেই বা কী! যারা গণ্ডগোল করে তারা তারা কি আর নিরাপত্তাকর্মীদের ভয় পায়!

কেন্দ্রের পিছনে বেশ জটলা। হঠাৎ কে বা কারা চিৎকার করতে লাগলো। কী ঘটেছে ঠিক বুঝা গেল না। আশে-পাশের যারা ছিল তাদের সবাই দৌঁড়ে পালাতে লাগলো। বেশ কিছুক্ষণ পর বুঝা গেল একদলকে অন্যদল ধাওয়া করছে। ধাওয়াকারীদের মধ্যে সবার পিছনে ছিল অনুপম। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে দৌঁড়াচ্ছে। মিনিট পাঁচেক পরে দেখা গেল এর উল্টো চিত্র! অনপম দৌঁড়ে পালাচ্ছে। হায়রে রাজনীতি!  দুর্বলেরা একজোট হলে সবলদেরও পালানোর পথ খুঁজতে হয়! দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে সে বাগানের মধ্যে ঢুকে পড়ল। অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে মুহূর্তইে সে গা ঢাকা দেয়।

সূর্য তখন অনেকটাই পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার পায়তারা করছে। অনুপম চাবাগানের ভিতর হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে থাকে। অনেকক্ষণ দৌঁড়ানোর পরে সে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে, এখন যেন তার দেহ চলাই ভার! শুধু কি তাই- হাঁপানি রোগীদরে মতো সে হাঁপাচ্ছেও। ভয়ে যতই সে হাঁপানির শব্দ নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করছে ততই যেন তা আরও বেড়ে যাচ্ছে!

বিস্তৃর্ণ চাবাগান। বাগানের নীরবতা ভেঙ্গে মাঝে মাঝে কোন অপরিচিত পাখি ডেকে ওঠলে সে হকচকিয়ে চায়। তার মনের ভেতর দুরুদুরু করে কেঁপে ওঠে। এই বুঝি বিরোধী পার্টির লোকেরা এল! এক অজানা ভয় তাকে ফেরারি আসামীর মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ক্লান্ত শরীরে সে একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য চোখ বুজে। হঠাৎ তার মনে পড়ল অনিন্দিতার কথা। এই সেরেছে! এখন তো অনিন্দিতার পার্কে থাকার কথা! আবার ভাবলো নিশ্চয়ই কল দিয়ে যাবে। আবার পরক্ষণই তার মধ্যে নেতিবাচক চিন্তাও ঢেউ খেলে গেল। আজ তার বাবার নির্বাচন। এ নির্বাচন রেখে সে কোনমতেই পার্কে আসবে না। না আসতে পারলেই ভাল।  আমি কী আর যেতে পেরেছি?

এমনিভাবে নিজেকে নিজের মতো করে প্রবোধ দিতে থাকে। হঠাৎ বাম দিক থেকে একটি সাপ ফোস করে ওঠে। অনুপম চোখ মেলে। হকচকিয়ে চায়। কী আশ্চর্য! সন্নিকটেই লাল জামা পরিহিত এক তরুণী অর্ধনগ্ন অবস্থায় উপুর হয়ে শুয়ে আছে। এই বাগানে কোনতরুণী একলা শুয়ে রয়েছে দেখে তার মধ্যে একদিকে যেমন ভীতি কাজ করলো তেমনি প্রাগৈতিহাসিক গল্পের ভিখুর মতো আদিম চিন্তাও ঢেউ খেলে গেল। অনুপম খুব সূক্ষ্ম কৌশলে চারদিক পর্যবেক্ষণ করে। কেউ কোথাও নেই। পৃথিবীর সকল নির্জনতা যেন এখন এই বাগানের মধ্যে খেলা করছে। চায়ের সবুজ পাতার ভাঁজে ভাঁজে যেমন চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য বিরাজ করছে তেমনি অনাদিকালের নির্জনতাও যেন লেপ্টে রয়েছে।

খানিক ক্ষণ নিজের মধ্যে কী যেন সে হিসেব করে। জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকার মতো বিড়বিড় করতে থাকে। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে মেয়েটির কাছে যায়। উপুর করা মাথা তুলতেই নিজের মধ্যে সে এক প্রচণ্ড শক খেল। এ যে অনিন্দিতা! এ যে তার প্রিয়তমা! মুখ জুড়ে ক্ষতাক্তা। রঙিন জামা জুড়ে অলঙ্কারবিহীন ছুপছুপে রক্ত।  অর্ধ উলঙ্গ বুক। যৌনাঙ্গের বলয় জুড়ে রক্তের নহরা এখনো বয়ে চলছে। হয়ত খানিক পূর্বেই কোন নরপশুর দল তার ওপর পাশবিক নির্যাতন করেছে!

অনুপম অস্থির হয়ে ওঠে। ফাঁসির রায় শোনার পর  আসামিদের যেমন হয় ঠিক তেমনি আর কি! এই অবস্থায় মেয়েটি বেঁচে আছে না মারা গেছে না তা বিন্দুমাত্রও সে বুঝারও চেষ্টা করলো না। কে এমন পশুর মতো আচরণ করেছে তাকে যে কঠিন শাস্তি দেওয়া উচিত এমন ভাবনা তার মনে একটিবারের জন্যও উদয় হল না। সে কেবল ভাবতে লাগলো এই অবস্থায় কেউ যদি তাকে দেখে ফেলে…!

গাছের নিবিড় ছায়াতেও সে প্রখররোদ্রে কর্মক্লান্ত মানুষের মতো ঘামতে থাকে। চায়ের ঝোঁপের স্বল্প অন্ধকারের মধ্যেও সীমাহীন অন্ধকার হয়ে ওঠতে থাকে তার ভবিষ্যৎ।

জাফলং, সিলেট, ২৯.১০.২০১৪

বাংলাদেশনিউজ
৩০.১১.২০১৪


Comments are closed.