>> ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে রেল দুর্ঘটনায় ২৩ যাত্রী নিহত >> ইতালীর হিমবাহ ধ্বসে চাপা পড়া ১০ জনকে জীবিত উদ্ধার মৃত ৫ নিখোঁজ ১৫ >> পাকিস্তানের শিয়া অধ্যুষিত এলাকায় বোমা বিস্ফোরণে নিহত ২১ >> ইতালির ভেরনায় বাস দুর্ঘটনায় ১৬ স্কুল ছাত্র নিহত

আদিবাসী দিবসে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সংবাদ সম্মেলনের পূর্ণ বিবরণ

নিউজডেস্ক, বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০১৪ উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ৫ আগস্ট ২০১৪ মঙ্গলবার সকাল ১১:০০টায় ঢাকা হোটেল সুন্দরবনে একটি সংবাদ সম্মেলন করে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে সংবাদ সম্মেলনে পঠিত বক্তব্যের পূর্ণ বিবরণ এখানে প্রকাশ করা হল।

Bridging the Gap: Implementing the Rights of Indigenous Peoples
“আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুক্তিকামী জনতার সেতুবন্ধন”

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০১৪ উপলক্ষে
সংবাদ সম্মেলন
৫ আগস্ট ২০১৪, মঙ্গলবার, সকাল ১১:০০ ঘটিকা, হোটেল সুন্দরবন, ঢাকা

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পক্ষ থেকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। প্রতি বছর আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

Santu Larma 2আপনারা জানেন, আগামী ৯ আগস্ট বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘ ঘোষিত ২০তম আদিবাসী দিবস উদযাপিত হবে। ১৯৯৩ সালকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ ঘোষণা করেছিল। সে সময় আদিবাসী বর্ষের মূলসুর ছিল “আদিবাসী জাতি ঃ এক নতুন অংশীদারীত্ব” (ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষবং : অ ঘবি চধৎঃহবৎংযরঢ়)। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৯৪ সালে রেজুলেশন ৪৯/২১৪ গ্রহণ করে ৯ আগস্টকে আদিবাসী দিবস হিসেবে পালনের জন্য সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে আহ্বান জানায়। জাতিসংঘ ১৯৯৫ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্রথম আদিবাসী দশক পালন করে। তারপর ২০০৫-২০১৪ সালের সময়কালকে দ্বিতীয় আদিবাসী দশক ঘোষণা করে যা এ বছর শেষ হতে চলেছে। আদিবাসী দিবস উদযাপনের মূল লক্ষ্য হলো- আদিবাসীদের জীবনধারা, তাদের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার, আদিবাসী জাতিসমূহের ভাষা ও সংস্কৃতি তথা আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার সম্পর্কে সদস্য রাষ্ট্র, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া, অআদিবাসী জনগণ ও সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেতন করে তোলা এবং আদিবাসী মানুষের অধিকারের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি করা।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
বিশ্বের ৯০টি দেশের প্রায় ৪০ কোটির অধিক আদিবাসী জনগণের মতো বাংলাদেশে বসবাসকারী ৩০ লক্ষ আদিবাসী জনগণও এবার জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস জাতীয়ভাবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত ২০১৪ সালের আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় “ইৎরফমরহম ঃযব এধঢ়: ওসঢ়ষবসবহঃরহম ঃযব জরমযঃং ড়ভ ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষবং”-এর সাথে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করেছে, “আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুক্তিকামী জনতার সেতুবন্ধন।”

জাতিসংঘের এ প্রতিপাদ্য বিষয়ের উদ্দেশ্য হলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একসাথে কর্মরত সরকার, জাতিসংঘ ও জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা, আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী ও তাদের সংগঠন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নীতিমালা ও কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বাস্তবায়নের গুরুত্বকে তুলে ধরা; এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জীবনের অন্যান্য সকলক্ষেত্রে আদিবাসী জনগণ যে বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে, তা কমিয়ে আনা।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে স্বীকৃত অনেক অধিকার এখনো রাষ্ট্রগুলো বাস্তবায়ন করেনি। আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের ন্যূনতম অধিকার সন্নিবেশ করা হয়েছে। কিন্তু সেই ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নেও রাষ্ট্রগুলো আশানুরূপভাবে এগিয়ে আসছে না। জাতিসংঘের দ্বিতীয় আদিবাসী দশক এ বছর শেষ হতে চলেছে। কিন্তু দ্বিতীয় আদিবাসী দশকের অভিষ্ট লক্ষ্যও কাক্সিক্ষত পর্যায়ে অর্জিত হয়নি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত রয়েছে। আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দেশে দেশে এখনো ব্যাপক ফারাক রয়েছে। তাই আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নে রাষ্ট্র ও অন্যান্য সকল পক্ষগুলোকে সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ সেই ১৯৭২ সালে আইএলও’র আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী কনভেনশন নং ১০৭ অনুস্বাক্ষর করলেও উক্ত কনভেনশনে স্বীকৃত আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকার তথা ভূমির উপর ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত অধিকার, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ লাভ, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি, সিদ্ধান্ত-নির্ধারণী ভূমিকা নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি অধিকার বাস্তবায়নে সরকার এখনো এগিয়ে আসেনি। কনভেনশনে স্বীকৃত অধিকারের সাথে আদিবাসীদের জন্য সরকারের নেয়া ইতিবাচক পদক্ষেপ যেমন- চাকরী ও শিক্ষা ক্ষেত্রে কোটা, বিশেষ কার্যাদি বিভাগের মাধ্যমে সমতলের আদিবাসীদের উন্নয়ন কার্যক্রম, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গঠন ও আইন প্রণয়ন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ইত্যাদি এর মধ্যে ব্যাপক ফারাক বা ব্যবধান রয়েছে।

কোন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন (কনভেনশন) অনুস্বাক্ষর করলে রাষ্ট্রের বাধ্যগত দায়িত্ব হচ্ছে সেই কনভেনশনে স্বীকৃত অধিকার জাতীয় আইনগুলোতে সন্নিবেশ করা বা প্রয়োজনে এ সংক্রান্ত স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন করা। কিন্তু সরকার এখনো আইএলও’র কনভেনশন নং ১০৭-এ স্বীকৃত অধিকারগুলো সংবিধানে যেমন সন্নিবেশ করেনি, তেমনি জাতীয় আইনগুলোতে সেই মানের অধিকারগুলো সন্নিবেশ করেনি বা বিশেষ কোন আইনও প্রণয়ন করেনি। তাই আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের প্রস্তাবিত “বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আইন”টি জাতীয় সংসদে পাশ করা হলে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে ফারাক বা ব্যবধান রয়েছে তা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম বিশ্বাস করে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মনে করে, আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুক্তিকামী জনতার সেতুবন্ধন রচনা গুরুত্বপূর্ণ।  দেশের প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি, সংগঠন ও গোষ্ঠীকে আরো অধিকতর পরিমাণে ঐক্যবদ্ধ ও সংহত হতে হবে। অপরপক্ষে রাষ্ট্রকে প্রকৃত অর্থেই গণতান্ত্রিক এবং আদিবাসী জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হতে হবে। আদিবাসীদের সঙ্গে দূরত্ব ও ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে সক্রিয় ও সংবেদনশীল হতে হবে। শুধু তাই নয়, আদিবাসী জনগণ যাতে তাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার ভোগ করতে পারে, তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। তাই আদিবাসী জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসমূহের, নাগরিক সমাজের, বেসরকারি সংস্থাসমূহের, মিডিয়া, সংস্কৃতিকর্মীদের, ছাত্র ও তরুণ সমাজের এবং সকলের সেতুবন্ধন রচনায় সবাইকে উদ্যোগী হওয়ার জন্য বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম আহ্বান জানাচ্ছে।

শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া, মানবাধিকার সংগঠন, এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আদিবাসী অধিকার রক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে। আদিবাসী জনগণের সাথে অআদিবাসী জনগণের মধ্যে সংহতি স্থাপন ও সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আদিবাসী জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংলাপ ও আলাপ-আলোচনার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেখানে আস্থাহীনতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব রয়েছে, সেখানে আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তি রচনায় কাজ করতে হবে।
আসুন, সকলে মিলে আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সকল বাধা-ব্যবধান দূর করে আদিবাসীদের পাশে দাঁড়াই। আদিবাসীদের অধিকার হলো মানবাধিকার। আদিবাসী ইস্যূতে জনসচেতনতা তৈরিতে সরকার, জাতিসংঘ, নাগরিক সমাজ ও গণ-মাধ্যমের বিশেষ ভূমিকা পালন করা জরুরি। জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্রে যে সকল অধিকার আদিবাসীদের দেওয়া হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে জনসাধারণকে সজাগ করা এবং আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি গ্রহণ নিশ্চিত করা সকলের দায়িত্ব। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম আশা করে যে, আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে সেতুবন্ধন রচনার কথা জাতিসংঘ বলেছে, সেই মূলসুর বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারও পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং আদিবাসী অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসবে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আপনারা নিশ্চয় জানেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আদিবাসী জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহতভাবে এগিয়ে চলছে। আগামী ২২-২৩ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একটি উচ্চ পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যা আদিবাসী বিষয়ক বিশ্ব সম্মেলন নামে অভিহিত করা হচ্ছে (অ যরময-ষবাবষ ঢ়ষবহধৎু সববঃরহম ড়ভ ঃযব এবহবৎধষ অংংবসনষু ঃড় নব শহড়হি ধং ঃযব ডড়ৎষফ ঈড়হভবৎবহপব ড়হ ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষবং)। এ বিশ্ব সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য হলো আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র এবং দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দশকের অভীষ্ঠ লক্ষ্য ত্বরান্বিত করা। সাধারণ পরিষদের এ উচ্চ পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন থেকে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী সংক্রান্ত ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক একটি কর্মসূচী-ভিত্তিক দলিল বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা যায়।

উল্লেখ্য যে, আদিবাসী বিষয়ক বিশ্ব সম্মেলনের প্রস্তুতি হিসেবে গত ২০১৩ সালের ১০-১২ জুন নরওয়ের আল্টা শহরে আদিবাসীদের বিশ্ব প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত প্রস্তুতি সভায় আদিবাসীদের ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার, আদিবাসী অধিকার বাস্তবায়নে জাতিসংঘের কর্মসূচী-ভিত্তিক কার্যপরিকল্পনা, আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বশাসিত সরকার ব্যবস্থা, স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি ইত্যাদি অধিকার সম্বলিত ঘোষণাপত্র (আউটকাম ডকুমেন্ট) গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম আশা করে যে, উক্ত আউটকাম ডকুমেন্ট অনুসারে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব সম্মেলনে আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠাকরণ সংক্রান্ত একটি কর্মসূচী-ভিত্তিক দলিল বেরিয়ে আসবে। সেরূপ একটি কর্মসূচী-ভিত্তিক দলিল যাতে বেরিয়ে আসতে পারে তার জন্য সর্বাত্মক ইতিবাচক ভূমিকা পালনের জন্য বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম বাংলাদেশ সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম আরো আশা করে যে, উক্ত আদিবাসী বিষয়ক বিশ্ব সম্মেলনে সদস্য-রাষ্ট্রগুলোর সাথে আদিবাসীদের সমান অংশগ্রহণ, সম সম্পৃক্ততা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আদিবাসীদের দৃশ্যমান ভূমিকা থাকবে। সদস্য-রাষ্ট্রের সাথে যাতে আদিবাসী প্রতিনিধিরা সেই বিশ্ব সম্মেলনে সম-অংশগ্রহণ ও সম-অংশীদারিত্ব থাকে সে ধরনের বলিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম বাংলাদেশ সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
এ বছর জাতিসংঘের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দশক (২০০৫-২০১৪) শেষ হতে চলেছে। ইতিপূর্বে প্রথম আন্তর্জাতিক দশক (১৯৯৫-২০০৪) সমাপ্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দশকের কর্মপরিকল্পনা হিসেবে মূল লক্ষ্য হলো-
:: আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতি-নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা;
:: আদিবাসী জীবনধারাকে সরাসরি প্রভাবিত করে এমন সকল ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় আদিবাসী জাতিসমূহের মতামত গ্রহণ করা;
:: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যতার সাথে যথাযথভাবে সঙ্গতি রেখে উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করা;
:: আদিবাসী নারী, শিশু ও তরুণ সমাজের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে আদিবাসীদের জন্য উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা; এবং
:: আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দশকের উক্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অনুসারে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরাম গঠন, আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কর্মব্যবস্থা (এমরিপ), আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক  স্পেশাল র‌্যাপোটিয়র নিয়োগ, আদিবাসী বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী তহবিল গঠন ইত্যাদি সহ আদিবাসীদের অধিকার ও আশা-আকাক্সক্ষার অগ্রগতির জন্য আন্তর্জাতিক কর্মকাঠামো গড়ে তোলার সফলতা অর্জিত হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আদিবাসী দশকের সেই সফলতা ও অর্জন এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেবল নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা পর্যায়ে সীমিত রয়েছে। এসব নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনাগুলোকে কর্মসূচী-ভিত্তিক বাস্তবায়নের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। অন্যান্য দেশের মতো এ দেশের আদিবাসী জনগণ এখনো নানামুখী শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে চলেছে। অব্যাহত শোষণ-বঞ্চনার কারণে তাদের আত্ম-পরিচয়, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এমতাবস্থায় আদিবাসীদের উপর চলমান শোষণ-বঞ্চনার অবসান তথা আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মসূচীকে অধিকতর পরিমাণে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে আরো একটি আন্তর্জাতিক আদিবাসী দশক ঘোষণা করার জন্য বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের সকল সদস্য-রাষ্ট্রকে আহ্বান জানাচ্ছে।

আপনারা জানেন, বাংলাদেশ একটি বহু জাতির, বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। এ দেশে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী ছাড়াও প্রায় ৩০ লক্ষ জনসংখ্যার ৫৪টির অধিক আদিবাসী মানুষ স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস করে আসছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে তাদের জীবন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আশা-আকাক্সক্ষা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আদিবাসী জনগণের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে তারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় যে, জতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও সরকার কখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে আদিবাসী দিবস উদযাপন করেনি। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে আদিবাসী দিবস উদযাপন করার জন্য বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আপনারা নিশ্চয় জানেন, বাংলাদেশের সংবিধানে এখনো আদিবাসী জাতিসমূহের জাতিসত্তা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভূমি অধিকারসহ মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি নেই। আদিবাসীদের আশা-আকাক্সক্ষাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ৩০ জুন ২০১১ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আদিবাসীদেরকে “উপ-জাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা আদিবাসী জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি সংবিধানে ৬(ক) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে আদিবাসী-বাঙালী নির্বিশেষে দেশের সকল জনগণকে ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এখানে আদিবাসীদের আত্ম-পরিচয়কে অস্বীকার করা হয়েছে। অধিকন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আদিবাসীদের কেবলমাত্র “অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের” বিধান রয়েছে। বস্তুত: সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টি বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোন সুযোগ নেই। আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সুরক্ষার সাথে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, ভূমি অধিকার তথা সকল ক্ষেত্রে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত-নির্ধারণী ভূমিকা এবং স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতির অধিকারের বিষয়টি গভীরভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, ভূমির উপর তাদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত অধিকার ছাড়া পৃথক বা বিচ্ছিন্নভাবে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত হতে পারে না। তাই সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আদিবাসী জাতিসমূহের আশা-আকাক্সক্ষা ও দাবী-দাওয়ার ভিত্তিতে আদিবাসী জাতিসমূহের জাতিসত্তা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভূমি অধিকারসহ মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
বাংলাদেশ কর্তৃক অনুস্বাক্ষরিত ১৯৫৭ সালের আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত আইএলও কনভেনশন নং ১০৭ ও ১৯৮৯ সালের ১৬৯ এবং ২০০৭ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র ও মানবাধিকার সংক্রান্ত অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তি মোতাবেক আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ভূমি ও ভূখন্ডের উপর অধিকার, ভূমি থেকে তাদেরকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ থেকে রেহাই পাওয়ার অধিকার, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার অধিকার, স্বজাতির লোকজনদের সাথে আন্ত:সীমানা যোগাযোগ ও সহযোগিতার অধিকার রয়েছে।

কিন্তু ১০৭ নং আইএলও কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করলেও কনভেনশনে সন্নিবেশিত অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার এগিয়ে আসেনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসীদের ভূমি জবরদখল ও তাদের চিরায়ত ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার হীন উদ্দেশ্যে আদিবাসীদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলা, আদিবাসীদের ভূমি জবরদখল ও উচ্ছেদ, আদিবাসী নারীর উপর ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণসহ নৃশংস সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আদিবাসী নারীর উপর সহিংসতার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল এই চার মাসের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতল অঞ্চলে কমপক্ষে ১৯ জন আদিবাসী নারী যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়িতে সবিতা চাকমাকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ২৬ মার্চ মহালছড়িতে ভারতি চাকমাকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। অপরদিকে সবিতা চাকমাকে হত্যার ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে প্রশাসন সেটেলার বাঙালিদের লেলিয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত করার অপচেষ্টা চালায়। গত ২৭ জুলাই শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতীতে ধর্ষণের হাত থেকে ভাইয়ের স্ত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে একজন আদিবাসী হাজং হত্যার শিকার হন। অন্যদিকে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে ২ আগস্ট ভূমিগ্রাসীদের হামলায় একজন আদিবাসী সাঁওতালকে হত্যা করা হয়েছে।

প্রভাবশালী ভূমিদস্যু কর্তৃক আদিবাসীদের ভূমি জবরদখলকে কেন্দ্র করে গত জানুয়ারী থেকে জুন মাসের মধ্যে ১০৬টি আদিবাসী পরিবার আক্রান্ত হয়েছে এবং এতে ৪২ জন হতাহতের শিকার হয়েছে। গত ৩০ মে স্থানীয় বাঙালি ভূমিদস্যুরা আদিবাসী খাসিদের জমি দখল করার উদ্দেশ্যে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার খাসিদের গ্রাম নাহার পুঞ্জির ৭৯টি খাসি পরিবারের উপর আক্রমণ করে। গত ৯ মে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান গং নিরীহ সাঁওতাল আদিবাসী শ্রমিকদের উপর হামলা চালিয়ে অন্তত: ৭ জন নারীসহ ১১ জনকে আহত করে।  নারী ও শিশুসহ আদিবাসীদের উপর সহিংসতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এসব মানবতা বিরোধী সহিংসতায় জড়িত অপরাধীদের বিচারের আওতায় না আনা। বস্তুত: অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় সারা দেশে আদিবাসীদের উপর সহিংসতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক ভূমি সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে পাহাড়ি-বাঙালি স্থায়ী অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে বর্তমানে বিজিবি, সামরিক বাহিনী বা আধা-সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প সম্প্রসারণ, পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন, সংরক্ষিত বন ঘোষণা, সেটেলারদের গুচ্ছগ্রাম সম্প্রসারণের নামে ভূমি অধিগ্রহণ এবং বহিরাগত ভূমিগ্রাসীদের ভূমি জবরদখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ২১টি জুম্ম পরিবারকে উচ্ছেদ করে বিজিবির ব্যাটেলিয়ন সদর দপ্তর স্থাপনের উদ্যোগ এবং রুমা উপজেলার পাইন্দু মৌজা ও পলি মৌজায় প্রায় ৫০০ মারমা পরিবারকে উচ্ছেদ করে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপন, রোয়াংছড়ি উপজেলায় রামজাদি জায়গা দখল করে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও জুম্মদের প্রথাগত ভূমি অধিকারকে লঙ্ঘন করে বনবিভাগ প্রায় ৫৩,০০০ একর মৌজা ভূমি সংরক্ষিত বন ঘোষণার উদ্যোগ নিচ্ছে। এছাড়া শত শত জুম্ম পরিবার উচ্ছেদ করে সাজেকের রুইলুই গ্রামে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন; রুমা উপজেলায় অনিন্দ্য পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন; বান্দরবান সদর উপজেলায় বিভিন্ন স্থানে ৬০০ একর জায়গা দখল করে কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। বাঘাইছড়ির দ্বিটিলা এলাকায় ও গঙ্গারাম দুয়ারে বৌদ্ধ মূর্তি নির্মাণে স্থানীয় প্রশাসন বাধা দিয়ে চলেছে। নাইক্ষ্যংছড়িতে প্রাক্তন এক ইউপি চেয়ারম্যান কর্তৃক ব্যাপক জুম ভূমি দখল; লামা উপজেলার লুলেইন মৌজার ২৫০টি ¤্রাে পরিবারকে উচ্ছেদের হুমকি ও ভূমিখেকো লাদেন গ্রুপ কর্তৃক ফাস্যাখালি ইউনিয়নের ৭৫টি পরিবারকে উচ্ছেদ করে ১৭৫ একর জায়গা জবরদখল এবং আরো ২২১টি পরিবারকে উচ্ছেদের হুমকি; কতিপয় ভূমিগ্রাসী কর্তৃক লামা উপজেলার রুপসী ইউনিয়নে প্রায় ৫০০ একর জায়গা দখলের অপচেষ্টা; রোয়াংছড়ি উপজেলায় বহিরাগত বাঙালি কর্তৃক ৩৩টি মারমা পরিবারের রেকর্ডীয় জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বন্দোবস্তকরণ ও জবরদখলের অপচেষ্টা; আলিকদম উপজেলায় জনৈক প্রভাবশালী ভূমিদস্যু কর্তৃক প্রায় ১,০০০ একর রেকর্ডীয় ও ভোগদখলীয় জমি জবরদখল ইত্যাদি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সংসদীয় ককাসের সংসদ সদস্যগণ দীঘিনালা পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ বন্ধ করা হয়নি। বৃহত্তর সিলেটে খাসি আদিবাসীদের ভূমি মালিকানা সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। কুলাউড়ায় ঝিমাই খাসিপুঞ্জি উচ্ছেদের ষড়য়ন্ত্র বন্ধ হয়নি। পানপুঞ্জির খাসি ও গারোদের ভূমি সমস্যার  কোনো সমাধান হয়নি। সরকার বনবিভাগের সাথে আদিবাসী ভূমি সমস্যার সমাধানে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হলেও মধুপুরের বনে মান্দি ও বর্মনদের ভূমি সমস্যা ও শত শত বনমামলার কোনো সুরাহা করেনি। টেকনাফ, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে রাখাইন জনগোষ্ঠী ও বৌদ্ধ মন্দিরের জমিজমা নিয়ে সমস্যার সমাধানের কোনো লক্ষণ নেই। রাখাইনদের পবিত্র সমাধিভূমি ও মন্দির আগেই দখল হয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের আমলে উত্তরবঙ্গের অনেক আদিবাসী দেশান্তরিত হয়েছে। সম্প্রতি দিনাজপুরে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আক্রমন চালানো হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠনের অঙ্গীকার করেও সরকার এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি, আদিবাসীদের মতামতও নেয়া হয়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন
বর্তমান সরকারের অনেক মন্ত্রী-আমলারা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের কেবল একের পর এক প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে। গত ৫ জানুয়ারী নির্বাচনের পর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আজ সাত মাস অতিক্রান্ত হলেও সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, বরং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরিপন্থী ও জনবিরোধী আইন প্রণয়ন ও কার্যক্রম হাতে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো- পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন না করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে কোনরূপ আলোচনা ও পরামর্শ ব্যতিরেকে সরকার একতরফাভাবে অর্ন্তবর্তীকালীন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন প্রণয়ন এবং আদিবাসী জুম্মদের অধিকার ও অস্তিত্বকে বিপন্ন করে ও পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অনিশ্চিত রেখে রাঙ্গামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ দেয়া, যা সরকারের চরম অগণতান্ত্রিক, জনবিরোধী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরিপন্থী মানসিকতারই প্রতিফলন বলে নি:সন্দেহে বলা যেতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে বিশেষত: পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম (উপজাতীয়) অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ; পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন বিষয় ও কার্যাবলী কার্যকরকরণ এবং এসব পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিতকরণ; পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকরণ; আভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তু ও প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের জায়গা-জমি প্রত্যর্পণ ও পুনর্বাসন;  সেনা শাসন ‘অপারেশন উত্তরণ’সহ সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার; অস্থানীয়দের নিকট প্রদত্ত ভূমি ইজারা বাতিলকরণ; পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল চাকুরীতে জুম্মদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তিন পার্বত্য জেলার স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগ; চুক্তির সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ সংশোধন; সেটেলার বাঙালিদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন ইত্যাদি বিষয়গুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে অগ্রগতি লাভ করেনি। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে অব্যাহতভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ সরকারের প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে এখন ক্লান্ত ও বিক্ষুব্ধ। তারা আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। প্রতিশ্রুতি নয়, তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রকৃত বাস্তবায়ন দেখতে চায়।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
দেশের গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজকে সাথে নিয়ে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।  দেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিক সমাজ আদিবাসী অধিকার রক্ষায় ও জনসচেনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। আজ আদিবাসী দিবসে আপনাদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, সংগ্রামের পথেই আদিবাসীরা একদিন না একদিন তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশ্বের অন্যান্য দেশের আদিবাসীদের মতো বাংলাদেশের আদিবাসীরাও আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন করতে যাচ্ছে। এ দিবসটি আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের পথে নতুন চেতনায় উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিন।

আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও অন্যান্য সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। এসব কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে-
:: ৬ আগস্ট বুধবার সকাল ১১:০০ ঘটিকায় ঢাকার শাহবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরে সামনে “আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি সংরক্ষণ এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত সুপারিশ বাস্তবায়ন” এর দাবিতে বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মানববন্ধন;
:: ৮ আগস্ট শুক্রবার বিকাল ৩:০০ ঘটিকায় সিরডাপ মিলনায়তনে “ভূমি থেকে আদিবাসী উচ্ছেদ বন্ধ ও তাদের মানবাধিকার সুরক্ষা ঃ রাষ্ট্রের ভূমিকা” শীর্ষক আলোচনাসভা; আয়োজক হলো এএলআরডি, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান-ঐক্য পরিষদ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামসহ ১৩টি সংগঠন এবং সন্ধ্যা ৬টায় গারো স্টুডেন্ট ইউনিয়নের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হবে;
:: ৯ আগস্ট শনিবার সকাল ১০:০০ ঘটিকায় আদিবাসী দিবসের দিনে  কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের মূল অনুষ্ঠান- সমাবেশ, র‌্যালী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান উদ্বোধক এবং জনাব রাশেদ খান মেনন, এমপি, মাননীয় মন্ত্রী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়াও দেশের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ উপস্থিত থেকে সংহতি জানাবেন;
:: ১০ আগস্ট রবিবার সকাল ১১:০০ টায় জাতীয় জাদুঘরের বেগম সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান;
:: ১১ আগস্ট বিকাল ৩:০০ ঘটিকায় কাপেং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শাহবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরের মূল অডিটরিয়ামে “দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দশক এবং বাংলাদেশের আদিবাসীদের পরিস্থিতি” শীর্ষক সেমিনার এবং বাংলাদেশ আদিবাসী সাংস্কৃতিক ফোরামের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।

এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় ও উপজেলায় যেমন- রাজশাহী, দিনাজপুর, নাটোর, ঠাকুরগাঁও, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নেত্রকোনা, সিলেট, মৌলভীবাজার, শেরপুর, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, কক্সবাজার প্রভৃতি স্থানে আদিবাসী দিবস উদযাপন করা হবে।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিতব্য এসব কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম আপনাদের সকলকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।

সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের দাবী-
১.    আদিবাসী জাতিসমূহের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুক্তিকামী জনতার সেতুবন্ধন রচনায় রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে;
২.    সংবিধান সংশোধন করে আদিবাসীদের অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে;
৩.    পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এ লক্ষ্যে সময়সূচি-ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে;
৪.    জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ২০০৭ সালে গৃহীত আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র অনুসমর্থন ও বাস্তবায়ন করতে হবে;
৫.    আইএলও কনভেনশন ১০৭ বাস্তবায়ন ও ১৬৯ নং কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করতে হবে;
৬.    আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ও প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে;
৭.    আদিবাসী অঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে আদিবাসীদের স্বাধীন মতামত গ্রহণ এবং প্রকল্পে আদিবাসীদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে;
৮.    বেহাত হওয়া সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের জায়গা-জমি পুনরুদ্ধার ও ভূমি সমস্যা সমাধানের জন্য ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে;
৯.    পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি এবং ৩০ জুলাই ২০১২ তৎকালীন আইনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্ত:মন্ত্রণালয় সভায় চূড়ান্তভাবে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৩-দফা সংশোধনী প্রস্তাব মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ সংশোধন করতে হবে;
১০.    জাতীয় সংসদে উত্থাপিত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন ২০১৪ বিল প্রত্যাহার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ বাতিল করা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড বিলুপ্ত করতে হবে;
১১.    আদিবাসী অধিকার আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং আদিবাসী অধিকার বিষয়ক জাতীয় কমিশন গঠন করতে হবে;
১২.    জাতিসংঘ ঘোষিত ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করতে হবে;

সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আপনারা আদিবাসীদের উপর মানবাধিকার লংঘনের প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে নানাভাবে এগিয়ে এসেছেন। আসুন এবারের আদিবাসী দিবসের মূলসুর “আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুক্তিকামী জনতার সেতুবন্ধন” রচনায় একসাথে কাজ করি।

আপনাদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা
সভাপতি
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম
০৮.০৮.২০১৪


Comments are closed.