>> ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন বিমান হামলায় নিহত আরও ৬১

ভারতের ভিসা : একান্ত অনুভবে

এম.এস.আলম

Indian visa‘প্রথম আলো’ জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত মে ০৯, ২০১৪ শুক্রবার ২৬ বৈশাখ ১৪২১ পৃ: ১২ চিঠিপত্র বিভাগে “ভারতীয় ভিসা” নিয়ে যে অভিযোগটি উত্থাপিত হয়েছে তা পড়ে আমার ও নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করার প্রয়াসে এবারের এই লেখা। ধন্যবাদ জানাই জনাব কাজল কুমার কুন্ডু আপনাকে। একজন সাবেক সিভিল সার্জন হয়ে আপনার মনোকষ্টের সাথে আমার একই ধরণের অনুভূতি শেয়ার করে নিতে চাই। একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা নিলফামারী জেলার বাসিন্দা, যেভাবে তিনি ও তার পরিবার “ভিসার আবেদন” অনুমোদিত না হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা পত্রিকায় তুলে ধরেছেন তাতে তিনি প্রশংসা পাওয়ার মতো কাজ করেছেন। আমার ভাবতে অবাক লাগে বন্ধু প্রতিম দেশের “ভিসা সংক্রান্ত” বিষয়ে যদি এতই কড়াকড়ি হয়ে থাকে তাহলে কর্তৃপক্ষ প্রথম চোটেই কাগজপত্র জমা নেওয়ার সময় তা যাচাই বাছাই করে নিলে এই কষ্টটা ভোগ করতে হয়না আমাদের। দ্বিতীয়ত: ভিসার জন্য টাকা লেনদেনের পর “ভিসা আবেদন নাকচ” করার প্রক্রিয়াটিও যথাযথ নয়। তবে যদি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি সদয় হয়ে ভারতীয় দূতাবাস ভিসা ফি (অনুমোদিত না হলে) ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন তাহলে অন্তত: আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ততার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেত। কোন কারণ প্রদর্শণ না করে এমনকি আমাদের কোন কথা বলার সুযোগ না রেখে যেভাবে পাসপোর্ট হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় তা অসৌজন্যমূলকও বটে।

এবার আমার নিজের কথায় ফিরে আসি। ফেব্রুয়ারী-মার্চ ২০১৪ ভিসা পেপার প্রসেসিং করে যথারীতি তারিখ পেলাম, ঢাকা গুলশানে ভারতীয় দূতাবাসের অফিসে সাক্ষাৎ এর জন্য, আমি এবং আমার সহধর্মীনি। ভারত যাওয়ার উদ্দেশ্য আমাদের পারিবারিক বন্ধু ও ছোট বেলার স্কুল সাথী দেবব্রত বাচ্চুর অসুস্থ্যতাজনিত কারন জানতে পেরে তাকে দেখতে যাওয়া। টাঙ্গাইল শহরে আমরা একমাথে লেখাপড়া, খেলাধুলা করেছি; ছোট থেকে বড় হয়েছি; পারিবারিক বন্ধন দিনে দিনে সুদৃঢ় হয়েছে; ওর একমাত্র মেয়ে “ঝিলাম”-এর বিয়েতে (১০ ডিসেম্বর ২০১১) কোলকাতায় আমরা প্রায় একমাস হাসি-আনন্দে কাটিয়ে এসছিলাম। আমাদের দুই ছেলে, বড় ছেলে শুভকে দেবব্রত-হেনা ওদের সন্তানের চোখে দেখে আজো। সে ব্যাঙ্গালোরে প্রায় ৬বছর থেকে পড়ালেখা করে এসেছে। আজকে সেও চাকুরীজীবি, তারও একটি মেয়ে সন্তান “শারিয়া” স্কুলের ছাত্রী। এর মাঝে ওরা কোলকাতা বেড়িয়ে এসেছে। ছোট ছেলে রাজী ও তার বৌ, দুই বাচ্চা নিয়ে (অহর/রায়ান) ভারতে গিয়েছে ওদের টানে। দেবব্রত-হেনা-ঝিলামদের সাথে আমাদের বন্ধুত্বটা কত গভীরে তা বলতেই এই অবতারনাটুকু করতে হলো। শুভকে সন্তান জ্ঞানে তার শারীরিক অসুস্থতার সময়ে ১৯৯৬ সালে ভারতে বাচ্চু-হেনা যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছিল তা ভুলবার নয়। তাই দেবব্রতের অসুস্থতার খবরে আমরা চিন্তিত হয়ে পড়ি। লব্দ প্রতিষ্ঠিত একজন একক প্রচেষ্টায় সফল ব্যবসায়ী কোলকাতা সিটিতে যাদবপুর এলাকায় তার সুন্দর দুটো বাড়ী রয়েছে। একমাত্র মেয়েটি বিয়ের পর শ্বশুরালয়ে চলে যাওয়ায় ওরা দুজন স্বামী-স্ত্রী খুব একলা একলা অনুভব করে। একমাত্র “ সাহা দা” আছেন ওদের নিত্য সহচর-বন্ধূ এবং আপনজন হিসাবে। আমাদের সাথে ফোন, ফ্যাক্স, মোবাইল, ই-মেইল, অনলাইনে যোগাযোগ অহরহ হয়ে থাকে। তাই জরুরীভাবে ওদের দেখতে যাওয়ার আশা করেছিলাম কোলকাতায়।

আমরা নির্দিষ্ট দিন তারিখ এবং সময় মিলিয়ে ঢাকা ভারতীয় দূতাবাসে গিয়ে হাজির হই। কাগজপত্র, ডকুমেন্টস যথা নিয়মে চেকিং এর পর জমা দেওয়া হলো সেই সাখে ৪০০+৪০০=৮০০ (আটশত) টাকা ভিসা ফি বাবদ জমা দেওয়া হলো। এরপর আমাদের পাসপোর্ট জমা রেখে একটি স্লিপ দিয়ে দেওয়া হলো-ভিসা প্রদানের তারিখসহ। আমার মনে একটা ছোট্ট সন্দেহ ছিল, শুনেছিলাম কমপক্ষে ছয়মাসের মেয়াদ না থাকলে সে পাসপোর্ট ভিসা দেওয়া হয় না। আমাদের পাসপোর্টগুলো সাত মাস সময় ছিল। তাই ভাবলাম জমা যখন দেখে শূনেই নিয়েছে তাহলে কোন অসুবিধা হবে না। দেবব্রতকে দেখতে যাব মনটা কেমন ছটফট করছিল-আর আল্লাহর দরবারে ওর আশু রোগমুক্তি কামনা করছিলাম।

সময় মতো যেদিন ভিসা আনতে গেলাম সেদিন তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে শূন্য হাতে ফিরে এলাম। অর্থাৎ পাসপোর্ট ফেরত দিল অথচ কোন কারণ না দেখিয়ে ভিসা রিফিউজ করা হয়েছে। আমি কারণ জানতে চাইলে উত্তর পেলাম- বাইরে (অফিসের ভিতরই) গিয়ে ওখানে কথা বলুন। সেই ওখানে গিয়ে দেখলাম শূন্য চেয়ার-টেবিল, কোন লোক নেই শেষে দারোয়ান টাইপের একজন (উর্দিপরা) কে জিজ্ঞাসা করলাম এখানকার কর্মরত লোক কোথায়? তিনি জানালেন তা তার জানার কথা নয়। এমন সময় সেখানে আরো দুজন লোক এলেন এবং তাদের ও একই অবস্থা জানলাম। তাদেরও এভাবে এখানে পাঠানো হয়েছে। প্রায় আধা ঘন্টা অপেক্ষা করে কারো কাছে থেকে কোন সঠিক জবাব না পেয়ে মনোকষ্ট নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম এবং দেবব্রতকে জানালাম আমরা ভিসাজনিত সমস্যার কারণে আসতে পারলাম না বলে দঃখিত।

আমাদের দেশ সার্কভুক্ত দেশ, বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারত। বাংলাদেশের  মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামে ভারতের অবদান আমরা শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি। তাহলে আমাদের দুই দেশে যাতায়াতের উপর অহেতুক এত প্রতিবন্ধকতা কেন? মনে পড়লো সম্প্রতি জনাব মোস্তফা জামান আব্বাসী (মরহুম আব্বাস উদ্দীনের ছেলে) গায়ক ও গবেষক এবং সুলেখক ইউরোপের স্পেন এবং পর্র্তুগাল গিয়েছিলেন বেড়াতে। সেখান থেকে ফিরে এসে পত্রিকায় লিখলেন-মনে করতে পারেননি তিনি ইউরোপের দুটো দেশে ভ্রমনে গিয়ে কোন প্রকার ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়েছে পাসপোর্ট, ভিসা বা আনুষাঙ্গিক কোন কাগজপত্র নিয়ে। ইউরোপের সব দেশেই ভ্রমনে একই অবস্থার চিত্র। ভাবতেই অবাক লাগে।

আরোও মনে পড়ে গেল ২০০৬ সনে একবার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে কোলকাতার ডাঃ কোনাল এর কাছে নেওয়া প্রয়োজন। পিয়ারলেস হাসপাতলের যেহেতু বছরখানেক আগে ঐ ডাক্তারের চিকিৎসায় আমার স্ত্রী তার গ্যাসটো আলসারেশন প্রবলেম থেকে সুস্থ্য হয়ে উঠেছিলেন। তাই তখন মতিঝিলে জীবন বীমা ভবনের নিচে “ভারতীয় ভিসা অফিস” ছিল এবং সেখানে ভিসা ফর্ম পুরণ করে যথারীতি জমা দিতে যাই তিন দিন চেষ্টার পর (লোকের ভীড়ের কারনে)। বাংলাদেশের ডাক্তার সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন, যেহেতু এই রোগী নিকট অতীতে কোলকাতা পিয়ারলেস হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে এসেছেন, সে কারণে তাকে আবার সেখানে রেফার করা যেতে পারে। সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও পিয়ারলেস হাসপাতালের কগজ একবছরের পুরনো বলে সরাসরি রিজেক্ট করে ভিসা ফর্ম জমা না নিয়ে নতুন করে কোলকাতা থেকে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন সংগ্রহ করে তারপর জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়। ক্ষোভে, দুঃখে ভিসা ফর্ম ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে নতুন করে ফর্ম লিখে তাতে ভ্রমণের উদ্দেশ্য বলে দুই দিন পর পর জমা দিই এবং সাতদিনের মাথায় ভিসা পেয়ে যাই এবং কোলকাতা গিয়ে যথারীতি স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যে ফ্রন্ট ডেস্ক গার্ল ভিসা ফর্ম ফেরত দিয়েছিলেন তাকে শুধু এটুকু বলে এসেছিলাম সেবার মনমানসিকতা তৈরী করে তারপর এ কাজে নিজেকে নিয়োজিত করুন। সত্য কথাটা উপলব্ধি না করে নানান অজুহাতে এবং সময়ক্ষেপন করে এই ধরণের কষ্ট কাউকে না দেওয়ার কথা বলেছিলাম।

আমরা ভারতে যাই মূলতঃ চিকিৎসার জন্য, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য, তীর্থভ্রমণ, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা সাক্ষাত করতে এবং ঘুরতে ফিরতে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে। আমাদের ভারত ভ্রমণ এখন অনেকটা নিয়মিত হয়ে গেছে। কোলকাতা, দিল্লী, আজমীর, ব্যাঙ্গালোর, মহিশূর, আগ্রা, রাজস্থান, মাদ্রাজ যাওয়া হয়েছে। আরো অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে ভারতে। সেগুলো দেখার প্রচুর আগ্রহ রয়েছে মনে। জানি না ভিসা জটিলতার প্রশ্নটি কাটিয়ে উঠে আবার কবে যেতে পারব-ভারত ভ্রমণে কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজনে।

জনাব কুন্ডু বাবুর কথার সাথে তাল মিলিয়ে বলতে চাই বর্তমানে ভারতের “ভিসা” পদ্ধতি যদি সহজীকরণ হয়ে থাকে তাহলে কঠিন কোনটি? যথাযথ কতৃপক্ষের কাছে উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি সঠিক ও সরল পথে চিন্তাভাবনা করে এবং বাস্তবতার আলোকে সত্যিকারের সহজ উপায় উদ্ভাবন করে আমাদের মতো সাধারন মানুষের কষ্ট লাঘবের করতে।

লেখকঃ প্রাক্তন জেনারেল ম্যানেজার, কেটিএম, কুষ্টিয়া ও কলামিষ্ট

bdn24x7.com, বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম, এসএস, জের, ২১.০৭.২০১৪


Comments are closed.