>> ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন বিমান হামলায় নিহত আরও ৬১

ভিন গাঁয়ের দেবদাস ও পার্বতী

আকতার হোসেন

Akhtar Hossainচন্দ্রবিন্দু, আমায় তুমি শেষ বিন্দুতে নিয়ে যাবে! কাঁখে কলস, হাতে বিজুলি চুড়ি, লোকে আমায় লক্ষ্মীছাড়া বলে।

আমায় তুমি পাড়া ঘোরাবে! রাতের আগেই যদি রাত আসে সেদিন তোমার সাথে রাত কাটাবো, আমায় তুমি শয্যায় নিবে। সাঁতার শেখাবে! ডুবে গেলে তুলে আনবে? কোলে তুলে হটাৎ করে ফেলে দেবে নাতো। বল।
ইতি তোমার লক্ষ্মী।

সত্যি সত্যি মেয়েটা একদিন রাতের অন্ধকারে চন্দ্রের বাড়িতে গিয়ে হাজির। লক্ষ্মীকে দেখে চন্দ্র বিরক্তি প্রকাশ করল। লক্ষ্মী সে সব গায়ে মাখল না। চন্দ্র ঘেমে উঠতে লাগল। যদি কেউ দেখে ফেলে, শুনে ফেলে মেয়ে লোকের কণ্ঠ, তাতে কলঙ্ক হবে।

সেভাবেই বললো কথাটা। লক্ষ্মী বললো সে কি গো, আমি কলঙ্কিত হতে এসে ভয় করছি না আর তুমি কলঙ্কের ভয়ে ওভাবে ঘেমে উঠছ। চন্দ্র দা, কলঙ্ক কাকে বলে তুমি জান। এই যে তুমি আমাকে প্রেমের ছোঁয়া দিতে আপত্তি করলে তাতেই আমার কলঙ্ক হল। আমি যাই, তোমার বুকে কয়েক পলক বেঁধে রাখলে সে কলঙ্ক হত না।

মেয়েটি সেই থেকে নিজেকে আড়াল করে নেয়। ছেলেটি হারিয়ে গেল অন্য ভুবনে। দাঁড়ি গোঁফ গজিয়ে হাতে ছাতা নিয়ে ঘুরতে লাগল। বাবুয়ানা আর ভীষণ স্ফূর্তি তাকে পেয়ে বসল।
কলিকাতার আলি গলিতে সে ঘুরে বেড়াতে লাগল। তিন বারের চেষ্টায় কলেজে ঢুকতে পেল। কলেজের মেয়েরা বড্ড হেলে হাটে। তাই দেখে নতুন বাবুর ধুতিতে ভাঁজ পড়তে লাগল। শহর আর গাঁয়ের মধ্য বিভেদ টেনে বললো, আধুনিক জীবন অনেক বেশি আনন্দ দেয়। আর সইল না, একদিন সত্যি সত্যি নাক গলাল সে। ‘ফুল নেবে’ এই বলে হাত বাড়িয়ে দিল একটি মেয়ের দিকে। সেই মেয়েটি ছিল বড্ড ন্যাকা। আমিষ খেত লুকিয়ে। কাটলেট, কলিজার সিঙ্গারা, ক্যান্টিনের চা কোন কিছুতেই বারণ ছিল না যেন। ফুল দেখে লাফিয়ে এক হাত তুলে দিল। পরের পয়সায় স্ফূর্তি হবে, যেমনটি তার স্বভাব।

যা হবার শেষে তাই হল। রাধার সাথে দুই মাস, মালতীতে তিন। বছর ঘুরতে দেখা গেল টিফিনের পয়সায় টান পড়তে শুরু করেছে। এদিকে বাবার মৃত্যু সংবাদ হজম করতে না করতেই তার মাও গত হলেন। আশিস, বিমল, হরি-কান্ত সবাই গেল পরের ক্লাসে। বেতন আসা বন্ধ হতেই বাক্স বেঁধে বর্ধমানের ট্রেন ধরল চন্দ্র।

কলেজ ফেল, তবুও গ্রামে সে কদর পেল। সম্মান পেল পণ্ডিত মশাইয়ের উপরে। অনেকেই বসবার জন্য চেয়ার এগিয়ে দেয়। একটা চেয়ার এগিয়ে দিল লক্ষ্মীর বাবা নিজেই। এই গায়ে তার লক্ষ্মী থাকে, তাকে না-দেখা পর্যন্ত মন ভরে কি করে।

কলিকাতার রাধা রানিদের প্রসঙ্গ এলে তখনই লক্ষ্মীর কথা মনে পড়ে। ছোট বেলায় লক্ষ্মী তার জন্য তামাক নিয়ে আসত পুকুর ঘাটে। বসে বসে সে তামাক টানত আর লক্ষ্মী উপর দাঁড়িয়ে পাহারা দিত। গাদা ফুল ডলে রুমালে সুগন্ধি মেখে দিত লক্ষ্মী আর সেই রুমাল শুঁকে তিনি গ্রাম চড়িয়ে বেড়াতেন। লক্ষ্মীর কাজ ছিল স্কুলের পড়া মুখস্থ করে চন্দ্রকে সেটা বুঝিয়ে দেয়া। লক্ষ্মীর মাথা ছিল ভাল তবুও তার কলেজে যাওয়া হয় নি। তার জন্য স্কুলই ছিল যথেষ্ট। মাস বিলম্ব করে চন্দ্র এলো লক্ষ্মীদের বাড়ি। চন্দ্রের ডাকে সে উত্তর দিল ভেতর থেকে। সবে বিধবা হয়েছে। মুখরা ভাবটা কেটে গেছে। জলে না নেমেই সে সাঁতার শিখেছে। ডুবতে ডুবতে বেঁচে গেছে। লক্ষ্মী তো আগেও ছিল এবার মায়াবতী হল। ভেতর থেকে জল খাবার পাঠিয়ে ভৃত্যকে বলল, ‘বাবুকে একটু ভাল মন্দ খেতে বলিস। গ্রামে তো আর গাড়ি ঘোড়া নেই। পায়ে হেটে পাড়া ঘুরতে হবে। শেষে মাথা ঘুরে না কোথাও পড়ে থাকে’।

চন্দ্র আরো একদিন এলো কিন্তু লক্ষ্মী সেবারও দেখা দিল না। চন্দ্র চিঠি লিখল। লক্ষ্মী উত্তর দিল না। লক্ষ্মীকে না বলে কলিকাতায় চলে যাওয়ার জন্য ক্ষমা চাইল তবুও লক্ষ্মী কিছুতেই নত হল না। একবার সেই পুকুর ঘাটে লক্ষ্মীকে পেয়ে চন্দ্র নিজেকে সঁপে দিল। লক্ষ্মী বললো এই যে আমার হাত ধরলে এতে পাপ হল। আগে যদি কলঙ্কিত করতে, ওই বুকে একটুখানি যায়গা দিতে তবে আজ পাপ হতো না। সেটা থাকত তোমার অধিকার। এ কাজ আর ভুলেও যেন না কর। তবে আমি গলায় দড়ি দিব। চন্দ্র বিছানা নিলো। ম্যালেরিয়ায় নীল হয়ে গেল। বিদায়ের ক্ষণ বুঝতে পেরে লক্ষ্মীকে খবর পাঠাল। পাঠশালার এক শিক্ষার্থী দুটো চিঠি নিয়ে এলো লক্ষ্মীর বাড়ি। একটি সযত্নে রাখা লক্ষ্মীর পত্র। যেটাতে সে শয্যা আশা করে চন্দ্রকে লিখেছিল। কি কারণে যেন আজো সেই চিঠিটি চন্দ্র আগলে রেখেছিল। অন্যটি চিঠিটি চন্দ্রের শেষ সাক্ষাৎ মিনতি, যাতে লেখা ‘একটি বার এসে দেখা দিয়ে যাও লক্ষ্মী’। হাতে হাতেই মাষ্টার মশাইয়ের জন্য উত্তর নিয়ে এলো বালক। এক লাইনের চিঠি লিখেছে লক্ষ্মী।

‘ভাব লক্ষ্মীকে ছেড়ে গেছ – মা লক্ষ্মীর আশ্রয় পেয়ো। প্রণাম।’

এই হল ভিন গাঁয়ের দেবদাস আর পার্বতীর গল্প। বেশি কিছু হয়তো বলার প্রয়োজন নেই। বালক ফিরে আসার আগেই তিনবার লক্ষ্মী লক্ষ্মী ডাক দিতে পেরেছিল বটে তবে চন্দ্রের সেই মুদিত নয়ন পদ্মের ন্যায় সশরীরে চিরকালের জন্য ডুবে গেল। খবরটি রটে যেতে বেশি সময় নিলো না। কান্নাকাটি করবার তেমন কেউ বেঁচে ছিল না শুধু মাত্র পিসি আর তার দুটি সন্তান। পিতা মাতা গত হয়েছিল বছর দুয়েক আগে। একটি ছোট বোন ছিল সেও ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়ে চলে গেছে। তবুও কোথা থেকে যেন প্রচণ্ড এক শব্দ ভেসে এলো। চন্দ্র চন্দ্র বলে কে যেন শব যাত্রাকে বিলম্বিত করে দিল।

শরত বাবু ঘটনাটি জানতে পারলে চন্দ্র-লক্ষ্মী নামে আর একটি অমর কাহিনী লিখে যেতে পারতেন। অথবা তার দেবদাস থেকেই শাখা গজিয়ে এ সমস্ত গল্প জন্ম নিচ্ছে হয়তো। কে জানে কোনটা সত্য।

বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম
০৭.০৭.২০১৪


Comments are closed.