>> ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন বিমান হামলায় নিহত আরও ৬১

মাদ্রাসা শিক্ষা জামাতীকরণ বন্ধ কল্পে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের স্মারকলিপি

নিউজডেস্ক, বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম

NCTB 1-horzবাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ), বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বাসদ) ও গণতান্ত্রিক ছাত্র কেন্দ্র সমন্বয়ে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মাদ্রাসা শিক্ষা পাঠক্রমে স্বাধীনতা ও মুক্তিযদ্ধের চেতনা পরিপন্থী বিষয়াবলী অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে জামাতীকরণ ও মওদুদীকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ করে পাঠ্যপুস্তক থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান-পরিপন্থী বিষয়সমূহ বাতিল করাসহ বিভিন্ন দাবিতে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছে। পাঠক সাধারণের অবগাতর জন্য পূর্ণাঙ্গ স্মারকলিপিটি এখানে উপস্থাপন করা হল।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ), বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বাসদ) ও গণতান্ত্রিক ছাত্র কেন্দ্র

তারিখ : ২২ জুন ২০১৪

বরাবর,
মাননীয় মন্ত্রী
শিক্ষা মন্ত্রণালয়
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

বিষয় : মাদ্রাসা শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের পাঠ্যসূচির জামাতীকরণ-মওদুদীকরণ বন্ধ করে পাঠ্যপুস্তক থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান-পরিপন্থী বিষয়সমূহ বাতিল করাসহ বিভিন্ন দাবিতে স্মারকলিপি।

জনাব,
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন গ্রহণ করুন।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা। দেশের ৫০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষা গ্রহণ করেন। এ সংখ্যা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের মূল ধারার শিক্ষাব্যবস্থা এমনকি রাষ্ট্রীয় মূলগত চেতনা থেকে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে সুদীর্ঘকাল ধরেই সুকৌশলে বহুদূরে অবস্থান করানো হয়। মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে এমন সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যার দ্বারা ঐ শিক্ষার্থীদের মনন-মস্তিষ্কে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং রাষ্ট্রের সংবিধানের মূলনীতি কোনোই প্রভাব ফেলে না। বরং তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-পরিপন্থী এবং সাম্প্রদায়িক পশ্চাৎপদ মননকাঠামোতেই অভ্যস্ত হয়ে গড়ে ওঠেন। ফলে রাষ্ট্রীয় চেতনাগত ঐক্য ও সংহতির পরিবর্তে রাষ্ট্রবিরোধী চেতনার ধারক হয়েই তারা বেড়ে উঠতে থাকেন। রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ডেও তারা প্রায়শই যুক্ত হয়ে পড়েন। এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এবং যুদ্ধাপরাধী অপশক্তি জামাত-শিবির চক্র এবং তাদের নেতা, ইসলামের ভ্রান্ত ব্যাখ্যাদানকারী মওদুদীবাদের সমর্থক হয়ে গড়ে ওঠেন। এ বিষয়ে মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের কতিপয় বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

আপনি জানেন, আলিয়া মাদ্রাসার ১ম (ইবতেদায়ী) থেকে ১০ম (দাখিল) শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সহযোগিতায় বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের তত্ত্বাবধানে রচিত ও প্রকাশিত হয়ে থাকে। এনসিটিবি’র পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, পুস্তক রচনা ও সম্পাদনার জন্য পৃথক পৃথক বিশেষজ্ঞ কমিটি রয়েছে। কিন্তু মাদ্রাসা বোর্ডের এ ধরনের কোনো কমিটি আছে কিনা তা জানা নেই। মাদ্রাসা বোর্ডের সূচনাকাল থেকেই এ অবস্থা বিরাজ করছে। মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড কেবলমাত্র আলিম শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ের সিলেবাস প্রণয়ন করে। নিজেরা কোনো বই প্রকাশ করে না। বোর্ডের সিলেবাসের আলোকে বাইরের প্রকাশকগণ বই প্রকাশ করে বাজারে বিক্রি করে। এসব বইয়ে লেখা থাকে- ‘বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত’। কোনো কোনো বইয়ে বোর্ড কর্তৃক প্রকাশককে দেওয়া অনুমোদনপত্রও সন্নিবেশিত থাকে। বোর্ড প্রণীত সিলেবাস-বহির্ভূত অনেক বিষয় এসব বইয়ে ছাপা হলেও তার কোনো তদারকি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড করে না। ফাজিল, কামিল ও অনার্স শ্রেণীর সিলেবাস প্রণয়ন করে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। তাদেরও কোনো ধরনের তদারকির ব্যবস্থা আছে বলে মনে হয় না। এর বাইরে নোট/গাইড বইগুলোতেও নানা অসামঞ্জস্য থাকে। সিলেবাসের বাইরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের দল জামাতে ইসলাম এবং তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী ইসলামী ছাত্র শিবিরের দলীয় মতাদর্শ সুকৌশলে এসব বইয়ে প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছে। এসব বইয়ে পবিত্র কুরআন ও হাদীসের বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে কোনো রেফারেন্স ব্যবহার না করে ইচ্ছামতো অনুবাদ ও ব্যাখ্যা হাজির করা হচ্ছে। এর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জামাত-শিবিরের আদর্শিক নেতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর মতাদর্শ প্রচার করা হচ্ছে।
বিশেষ কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই এ অপকর্মটি করে আসছে। এসব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- আল ফাতাহ পাবলিকেশন্স, আল বারাকা প্রকাশনী, পাঞ্জেরী প্রকাশনী, আল-মদীনা প্রকাশনী, কামিয়াব প্রকাশনী, মিল্লাত প্রকাশনী, ইমতেহান প্রকাশনী, ইসলামিয়া কুতুবখানা, মাদ্রাসা লাইব্রেরি, আল-আরাফা প্রকাশনী ইত্যাদি। এসব প্রতিষ্ঠান জঙ্গিবাদের প্রধান অর্থনৈতিক উৎস ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডসহ জামাতী অন্যান্য আর্থিক উৎসের সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে।

এসব বইয়ে প্রকাশিত বিভ্রান্তিকর এবং মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধানের মূলনীতি-পরিপন্থী কিছু বিষয় আপনার সামনে তুলে ধরছি:

“বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড এর সম্পূর্ণ নতুন সিলেবাস অনুযায়ী” আল ফাতাহ পাবলিকেশন্স কর্তৃক আলিম শ্রেণীর ‘ইসলামী পৌরনীতি’ বইয়ের ৫৬ নং পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে-
“যুগে যুগে ব্যক্তি সমষ্টি তথা সমিতি, সংঘ, দল প্রভৃতিও ইসলামী মূল্যবোধের অনুশীলনে যথেষ্ট অবদান রাখছে। বর্তমান শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বে বহু দেশে সংঘ বা দল সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইখওয়ানুল মুসলেমীন, ইন্দোনেশিয়ান শরীয়ত পার্টি, মালয়েশিয়ায় প্যান মালেয়ান ইসলামী এসোসিয়েশন, ভারতীয় উপমহাদেশে ও আফগানিস্তানে জামায়াতে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি রাজনৈতিক দল এবং ছাত্রদের মধ্যে সাবেক ইসলামী ছাত্র সংঘ, ছাত্র শক্তি পরে ইসলামী ছাত্র শিবির প্রভৃতি ছাত্র সংগঠনের যৌথ প্রচেষ্টায় মুসলিম সমাজে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হয়েছে বা হচ্ছে।”

এখানে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্র সংঘ, ছাত্র শিবিরসহ এমন কিছু দল ও সংগঠনের কথা লেখা হয়েছে, যারা ইতোমধ্যেই যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধের বিচারের একাধিক রায়ের সাথে দেওয়া পর্যবেক্ষণে তাদের যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সুস্পষ্ট। এদের বিরুদ্ধে এ অপরাধের দায়ে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এরা দেশে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী কার্যক্রমের সাথেও যুক্ত।

“বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সর্বশেষ সিলেবাস অনুযায়ী আলিম শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে রচিত” আল-বারাকা লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত ‘ইসলামী পৌরনীতি’ ১ম ও ২য় পত্র বইয়ের ৭০ নং পৃষ্ঠায় জাতীয়বাদ সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে-

“সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী (র.)-এর মতে, মুসলমান হৃদয় ও মনের এক প্রান্ত দিয়ে যখন জাতীয়তাবাদের চেতনা অনুপ্রবেশ করে, তখন অন্য প্রান্ত দিয়ে ইসলাম নিষ্ক্রান্ত হয়। যে মুসলিম নিজেকে জাতীয়তাবাদের ধারক বলে জাহির করেন, তিনি ইসলামের আলোকবর্তিকা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইসলামের বিশ্বজনীন আদর্শের বিপরীতে জাতীয়তাবাদ মানুষে মানুষে বিভক্তি আনে। জাতিতে জাতিতে হিংসা, বিদ্বেষ, লড়াই ও সংঘাত জাতীয়তাবাদেরই পরিণাম।”

এ বইয়ের ৭১ নং পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে- “সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর ভাষায়, জাতীয়তাবাদ হচ্ছে বর্তমান বিশ্বে মানবতা যেসব বিপর্যয় ও বিপদাপদে নিপতিত তার মূল কারণ। ইসলামী চিন্তাবিদগণ বিদেশি আধিপত্য প্রতিহত করতেও জাতীয়বাদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার বিরোধী। জনগণের ভোটাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সংকীর্ণ চেতনাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের সাথে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী বিশ্বজনীনতার কোনো সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

এ বইয়ের ৮০ নং পৃষ্ঠায় মওদুদীকে ‘বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, বিংশ শতাব্দীর ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনের নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বইয়ের ৮৫ ও ৮৬ নং পৃষ্ঠায় ‘ইসলামী রাষ্ট্রের সংজ্ঞা’য় মওদুদী ও গোলাম আযমের উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে।

এই মওদুদী ইসলামের অপব্যাখ্যাদানকারী। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত ইসলামী চিন্তাবিদগণ তার ব্যাখ্যাকে ‘ইসলামবিরোধী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমনকি খোদ পাকিস্তানের আদালতেও তার মৃত্যুদ- ঘোষণা করা হয়েছিল। গোলাম আযম ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত সকল যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রধান হোতা ও পরিকল্পনাকারী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই অপরাধে তাকে ৯০ বছরের কারাদ- দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে কারান্তরীণ রয়েছেন। এহেন ঘৃণ্য অপরাধীদের ‘ইসলামী চিন্তাবিদ’ এবং ‘ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনের নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করা রীতিমতো রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধের সামিল। তাছাড়া আমাদের সংবিধানের চার মূলনীতিতেই যেখানে ‘জাতীয়তাবাদ’ রয়েছে, জনগণের ভোটাদিকার আমাদের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য, তাই তার বিরোধিতা করা সংবিধানের সুস্পষ্ট লংঘন।
পূর্বোক্ত বইয়ের ৩৮৭ নং পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে-

“ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে কোনো কল্যাণমূলক মতবাদ পৃথিবীতে নেই। ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতার নামান্তর। ধর্মকে ধ্বংস করার কৌশল হিসেবে রচিত একটি অপতন্ত্র।………. এটি ইসলামী ধর্ম বিশ্বাসের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।”

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েও সংবিধানের চার মূলনীতিতে অস্বীকার করা হয়েছে।

ইসলামিয়া কুতুবখানা থেকে প্রকাশিত ‘ইসলামী পৌরনীতি’ বইয়ের ৫৮১-৫৮২ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে-

“১৯৭২ সালে বাংলাদেশের একটি পরিপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান রচিত হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার মাত্রায় এ সংবিধান ভারতকেও ছাড়িয়ে গিয়ে রুশ মডেল ধারণ করে। ……… চার দলীয় ঐক্যজোটের অন্যতম দুটি দল হলো জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোট। তাই বলা যায়, এ দেশে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠাকরণের ক্ষেত্রে ইসলামী দলগুলো অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। সময়ের বিবর্তনে এদেশে হয়তো একদিন তাওহীদের পতাকা উত্তোলিত হবে- এমন ধারণা এদেশের ইসলাম প্রিয় জনগণের।”
এ বক্তব্যও বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের সাংঘর্ষিক বক্তব্য জামায়াতে ইসলামের গঠনতন্ত্রে থাকার কারণে উচ্চ আদালতের রায়ে তাদের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে।

ইসলামিয়া কুতুবখানা থেকে প্রকাশিত ‘ইসলামী পৌরনীতি’ বইয়ের ৩৩৪ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে-

“নারীরা দৈহিক ও প্রাকৃতিক কারণে পুরুষের তুলনায় অক্ষম। ফলে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক পদে নারী নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা প্রায় সর্বজন স্বীকৃত। আর এ কারণেই নেতৃত্বদান কেবল পুরুষের পক্ষেই সম্ভব।”

এই বক্তব্য নারীর অধিকার এবং নারীর ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে। এর মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারীর ক্ষমতায়নের নীতির বিরুদ্ধেই কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে।

আলিম শ্রেণীর ‘ইসলামের ইতিহাস’ বইটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হিসেবে রচিত হয়েছে। ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’ থেকে শুরু তরে ভারত বিভক্তি তথা পাকিস্তান সৃষ্টি পর্যন্ত ইতিহাস এতে সন্নিবেশিত হয়েছে। কিন্তু সচেতনভাবেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানপন্থীদের দ্বারাই উদ্দেশ্য-প্রণোদিতভাবে সিলেবাসটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

এসব বইয়ের প্রকাশনা ও শিক্ষার্থীদের গেলানোর সাথে জড়িতদের যুদ্ধাপরাধী জামাত-শিবির চক্রকে পাঠ্যপুস্তকের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার একটি হীন উদ্দেশ্য রয়েছে। আমরা যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দীর্ঘ সংগ্রাম করে আসছি, যে সময়ে বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচার কাজ সাহসের সাথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে, যুদ্ধাপরাধের দায়ে দল হিসেবে জামাতের বিচারও যে সময়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, সেই সময়ে এসে সেই জামাত-শিবিরকে প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের দলীয় বিভ্রান্ত ও রাষ্ট্রবিরোধী মতাদর্শ প্রচার আমাদের হতবাক করে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকারের শাসনামলে কিভাবে এগুলো চলতে পারে?

এ তো গেল মাদ্রাসা বোর্ডের পাঠ্যক্রমের কথা। জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এর প্রকাশিত কতিপয় বইয়ের প্রচ্ছদ ও পাঠ্যবিষয় পরিবর্তন-পরিমার্জনের নামে সাম্প্রদায়িকীকরণের একটা সুক্ষ্ম চেষ্টার কথাও আমরা জানতে পেরেছি। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী সাধারণ শিক্ষার বাংলা, ইংরেজিসহ মূল বিষয়গুলো মাদ্রাসায় অভিন্ন পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক পড়ানোর কথা। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার এ বইগুলো মাদ্রাসার উপযোগী করার নামে সেগুলোর সাম্প্রদায়িকীকরণের আয়োজন করা হচ্ছে। এ জন্য যে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তারা সাধারণ শিক্ষার বিভিন্ন বইয়ের এই সাম্প্রদায়িক পরিবর্তন আনার সুপারিশ করেছেন। আপনি জানেন, মাদ্রাসা শিক্ষার উপযোগী করার নামে সাধারণ শিক্ষার ৯টি বইয়ে এমন কিছু পরিবর্তন আনার সুপারিশ করা হয়েছে যা শিক্ষার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ও সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিশেষজ্ঞ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে সাধারণ শিক্ষার ৬ষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ লেখাটি পড়বে। সেখানে গিটার হাতে জর্জ হ্যারিসনের ছবি থাকবে। কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রণীত বইয়ে হ্যারিসনের ছবিটি বাদ দেওয়া হবে।

তৃতীয় শ্রেণীর ‘আমার বাংলা বই’ এর মাদ্রাসা সংস্করণের জন্য বইটির প্রচ্ছদ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশেষজ্ঞ কমিটি। সাধারণ শিক্ষার ঐ বইটির প্রচ্ছদে নৌকায় বসে এক কিশোর হাফ প্যান্ট পরে নৌকা বাইছে আর এক কিশোরী শাপলা ফুল তুলছে- এমন একটি ছবি আছে। কিন্তু বইটির মাদ্রাসা সংস্করণের প্রচ্ছদে কিশোরকে পায়জামা পরানো হবে আর কিশোরীর মাথায় হিজাব দেওয়া হবে। ঐ কিশোরীর হাফ হাতা জামাকে ফুল হাতা করে দেওয়া হবে।

পঞ্চম শ্রেণীর ইংরেজি বইয়ের প্রচ্ছদে ফুল, পাখি, প্রজাপতি ও কাঁশবন রয়েছে। এর মধ্যে নৌকা বাইছে এক কিশোর আর নৌকার অপর প্রান্ত ফ্রক পরে বসা রয়েছে কিশোরী। এই প্রচ্ছদটিকে মাদ্রাসা-উপযোগী করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদে এক গ্রামীণ নারী পানির কলসি নিয়ে ঘরে ফিরছেন। তার মাথায় ঘোমটা দেওয়া। পাশে আরেক নারী নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়ানো। কিন্তু তার ঘাড়ের পাশ দিয়ে সামান্য পিঠ দেখা যায়। শিল্পীর আঁকা পিঠের এই অংশটি ঢেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অষ্টম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে লালন শাহ এর লেখা ‘মানবধর্ম’ কবিতাটি বাদ দিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য ফররুখ আহমেদের ‘মেঘ বৃষ্টি আলোর দেশে’ কবিতাটি প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কারণ লালন শাহ এর ঐ কবিতার প্রথম লাইন হলো- ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’।

একই বইয়ে কেবলমাত্র সাম্প্রদায়িক কারণে বিপ্রদাস বড়–য়ার ‘মংডুর পথে’ গদ্যটি বাদ দিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের পড়ানো হবে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর ‘মদীনার পথে’। ঠিক একই কারণে নবম-দশম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে জ্ঞানদাশের লেখা ‘সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু’ কবিতাটি বাদ দিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য সংযুক্ত করা হবে মুহাম্মদ সগীরের লেখা ‘বন্দনা’ কবিতাটি।

বিষ্ময়কর হলেও সত্য এই বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রখ্যাত লেখকদের লেখাও বদলে দিতে পারেন তাদের কমিটির সিদ্ধান্তে। অষ্টম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘তৈলচিত্রের ভুত’ গদ্যের নামই তারা বদলে দিয়েছেন। সেখানে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে ‘তৈলচিত্রের আছর’ নামটি।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ স্পষ্টভাবে মনে করি, কেবলমাত্র যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামাত-শিবির নিষিদ্ধ করলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত এবং জঙ্গিবাদ নির্মূল করা যাবে না। বরং শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাম্প্রদায়িকীকরণ এবং বিশেষ করে মওদুদীকরণ-জামাতীকরণের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারলে জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন সম্ভব নয়। বরং শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সাম্প্রদায়িকতার ভুত তাড়িয়েই নাগরিকের চিন্তা ও মননকাঠামো থেকে সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করতে হবে। যেহেতু দেশের মোট শিক্ষার্থীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষা গ্রহণ করেন, তাই শিক্ষার এই স্তরটিকে অবহেলা করার কোনোই সুযোগ নেই। বরং মাদ্রাসা শিক্ষার আড়ালে যাতে উগ্র সশস্ত্র জঙ্গিবাদের জন্ম ও বিস্তার লাভ না করতে পারে, তার জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তককে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণা থেকে বের করে নিয়ে আসতে হবে।

এজন্যঃ

১. মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠ্যপুস্তক থেকে রাষ্ট্রীয় মূল চেতনা ও সংবিধান-পরিপন্থী সকল অধ্যায় ও বিষয়বস্তু বাদ দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে হবে।
২. সাধারণ শিক্ষার যে বিষয়গুলো মাদ্রাসায় পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তার অভিন্ন পাঠ্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।
৩. মাদ্রাসা বোর্ড এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির আলোকে বাইরের প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত বইয়ের বিষয়বস্তুর উপর কঠোর মনিটরিং করতে হবে। যে সকল বইয়ে রাষ্ট্রবিরোধী পাঠ্যসূচি আছে, সেগুলো বাজেয়াপ্ত করতে হবে। এসব বইয়ের লেখক ও প্রকাশকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪. এনসিটিবি’র মতো মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, পুস্তক রচনা ও সম্পাদনার জন্য জাতীয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে। আরবি ভাষার অনুবাদের ক্ষেত্রে জামাতীদের বাদ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত আলেম-ওলামা ও ইসলামী চিন্তাবিদদের দিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে।
৫. বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সরকার ১ম থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যস্ত প্রায় ৪৯ লক্ষ ৭১ হাজার ১২৩ জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে বই প্রদান করে থাকে। আলিয়া মাদ্রাসার আলিম থেকে কামিল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ। যেখানে সরকার প্রায় ৫০ লক্ষ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে পুস্তক প্রদান করতে পারে, সেখানে অতিরিক্ত মাত্র সাড়ে ৩ লক্ষ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে পুস্তক প্রদান করা হলে সরকারের যে আর্থিক ব্যয় হবে এর চেয়ে রাষ্ট্রের কল্যাণ হবে অনেক বেশি।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আশা করে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে আপনার নেতৃত্বে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে অপরিসীম ভূমিকা রাখছে, সেই ধারা অব্যাহত রাখার জন্য মাদ্রাসা শিক্ষার উপরোল্লিখিত বিষয়সমূহ সহ অন্যান্য অসংগতি দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উপরোক্ত ৫টি দাবি পূরণ করার মাধ্যমে এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে বলে আমরা মনে করি।

বিনীত,

এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ
সমন্বয়ক, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
সিদ্দিকী নাজমুল আলম
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

বাপ্পাদিত্য বসু
সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী
তানভীর রুসমত
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী

মুহাম্মদ সামছুল ইসলাম সুমন
সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ)
মোঃ শাহজাহান আলী সাজু
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ)

মঞ্জুর রহমান মিঠু
সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন
নজরুল সিকদার
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন

জাহিদুর রহমান খান
আহ্বায়ক, বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি
আব্দুল জলিল শান্ত
যুগ্ম আহ্বায়ক, বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি

মনিরুজ্জামান জুয়েল
সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বাসদ)
গোলাম রাব্বানী
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বাসদ)

মোস্তাফিজুর রহমান মুক্তা
সভাপতি, গণতান্ত্রিক ছাত্র কেন্দ্র
দেলোয়ার হোসেন বিজয়
সাধারণ সম্পাদক, গণতান্ত্রিক ছাত্র কেন্দ্র

বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম
২৩.০৬.২০১৪


Comments are closed.