>> জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩০ ডিসেম্বর : শিক্ষামন্ত্রী >> ইয়েমেনের রাজধানী সানায় আবার সৌদি বিমান হামলা নিহত ৩ >> হবিগঞ্জে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে ২ জন নিহত

ছায়া

আর. কে. নারায়ণ
অনুবাদ: আনিকা শাহ

Chhaya“কালকে ছবি দেখতে যাবার জন্য আমাকে চার আনা দিতেই হবে”— সাম্বু দাবি করলো। মা আঁতকে উঠলেন। কী করে পারলো ছেলেটা! ছবিটা বের হবার ছয় মাস আগে থেকেই তিনি ভয়ে ভয়ে ছিলেন। মানুষ কী করে ওকে ছবিতে দেখতে পারবে যখন তারা জানে যে ও বাস্তবে আর নেই? খানিক আশা ছিল যে প্রযোজকরা হয়তো তাঁর অনুভূতির কথা ভেবে ছবিটা বের করবে না। ছেলেপুলেরা যখন টমটম আর ব্যান্ড বাজিয়ে প্ল্যাকার্ড আর তাঁর স্বামীর মস্ত রঙিন ছবি নিয়ে একটা মিছিল করলো, তখন কিছুদিনের জন্য শহর ছেড়ে যাবার সংকল্প করেছিলেন তিনি, যদিও সেটা ছিল অযৌক্তিক সংকল্প, মরিয়া হয়ে করা। আর এখন ছবিটা মুক্তি পেয়েছে। তিন গলি পরের থিয়েটারে তাঁর স্বামী দিনে কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা করে কথা বলবে, হাঁটবে-চলবে, গান গাইবে।

সাম্বু এত উচ্ছ্বসিত ছিল যেন ওর বাবা আবার বেঁচে উঠেছেন।
“মা, তুমিও ছবি দেখতে যাবে না?”
“না।”
“প্লিজ, প্লিজ, তোমাকে যেতেই হবে।”

তাঁকে তখন ব্যাখ্যা করতে হলো কেন তাঁর পক্ষে ছবিটা দেখতে যাওয়া একবোরেই অসম্ভব। ছেলেটার ছিল এক ধরনের বেপরোয়া যুক্তি— “কেন, অসম্ভব কেন হবে? তুমি কি রোজ রোজ ওর ছবি, এমনকি দেয়ালের ওই বিশাল ছবিটাও দেখছ না?”
“কিন্তু ছবিগুলো তো আর কথা বলে না, হেঁটে বেড়ায় না, গানও গায় না।”
“তারপরও জীবন্ত ছবির চাইতে এই ছবিই তোমার বেশি পছন্দ!”

এর পরের পুরোটা দিনই সাম্বুর উত্তেজনায় কাটলো। ক্লাসে শিক্ষক যখনই ওর ওপর থেকে চোখ সরাচ্ছিলেন, সাম্বু ঝুঁকে পড়ে পাশের জনকে বলছিল, “এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য আমার বাবাকে দশ হাজার রুপি দেয়া হয়েছিল। আমি যাচ্ছি আজকে বিকালে দেখতে। তুই যাবি না?”
“কুমারী দেখার জন্য!” বন্ধুটি মুখ বাঁকালো। তামিল ছবি ছিল তার ঘোর অপছন্দের। “আমি ওই পথই মাড়াবো না।”
“এটা অন্য তামিল ছবিগুলোর মতো না। বাবা প্রতি রাতে আমাদের ছবির গল্প পড়ে শোনাতো। খুব ভালো কাহিনী। বাবা নিজেই পুরো গল্পটা লিখেছিল। লেখা আর অভিনয়ের জন্য তাকে দশ হাজার রুপি দেয়া হয়েছিল। তুই চাইলে আমি তোকেও নিয়ে যেতে পারি।”
“আমি কোনো তামিল ছবি দেখবো না।”
“এইটা আর-দশটা  তামিল ছবির মতো না। এইটা একদম ইংরেজি ছবির মতো ভালো।”

কিন্তু সাম্বুর বন্ধু গোঁ ধরেই রইলো। সাম্বুকে একাই যেতে হলো ছবি দেখতে। ছবিটায় ছিল তামিল ফিল্মে নতুন ধারা সৃষ্টির একটা প্রয়াস— আধুনিক গল্প এবং অপেক্ষাকৃত কম গানবাজনা। গল্পটা ছিল কুমারীর— কমবয়সী এক মেয়ে, যে কিনা চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে করতে রাজি না হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে ও স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে চেয়েছিল। ফলশ্রুতিতে তার কঠোর বাবা (সাম্বুর বাবা) তাকে তাড়িয়ে দেয় এবং শেষমেশ ক্ষমাও করে দেয়।

সাম্বু চার-আনা ক্লাসে বসে ছবি শুরুর জন্য ব্যগ্রভাবে অপেক্ষা করতে লাগলো। ছয় মাস হয় সে তার বাবাকে দেখেনি, বাড়িতে ওর বাবার কথা খুব মনে পড়তো।

হল অন্ধকার হয়ে এলো। ট্রেলার আর বিজ্ঞাপনগুলো সাম্বুকে আগ্রহী করলো না। শেষপর্যন্ত ওর বাবাকে পর্দায় দেখা গেল। বাসায় যেমন ধুতি আর শার্ট পরতেন তেমনই পরে ছিলেন ছবিতেও, বাসায় নিজের টেবিলে যেভাবে বসে থাকতেন, সেভাবেই বসে ছিলেন। এমন সময় ছোট একটা মেয়ে এলো, তিনি ওর মাখায় হাত দিয়ে ঠিক সেভাবেই কথা বলতে লাগলেন যেভাবে সাম্বুর সাথে কথা বলতেন। তারপর তিনি মেয়েটিকে পাটিগণিত করাতে লাগলেন। মেয়েটা হাঁটুর উপর স্লেট রেখে বসলো আর তিনি বলতে লাগলেন, “একজন গাড়োয়ান প্রতি মাইলের জন্য দুই আনা চায়। রামের কাছে তিন আনা আছে। গাড়োয়ান তাকে কতদূর নিয়ে যাবে?” মেয়েটা মিটমিট করে তাকিয়ে পেন্সিল কামড়াতে লাগলো। “কিছু একটা বলো, কুমারী,” সাম্বু বিড়বিড় করতে লাগলো। “নাহলে এক্ষুণি একটা চাটি খেতে হবে। আমি ওকে তোমার চাইতে ভালোভাবে চিনি।” কুমারী অবশ্য অঙ্কে সাম্বুর চাইতে ভালো ছিল। ও সঠিক উত্তরটাই দিলো। বাবা তাতে খুব খুশি হয়ে উঠলেন। সাম্বু যখন কোনো অঙ্ক ঠিকমত করতো, তিনি কেমন খুশিতে লাফিয়ে উঠতেন! সাম্বুর মনে পড়লো কিভাবে একবার সে ভুল করে ফুটো চৌবাচ্চা আর কলের অঙ্কের ঠিক উত্তরটা বের করে ফেলেছিল। বাবা প্রায় লাফ দিয়ে উঠেছিলেন চেয়ার থেকে, চৌবাচ্চা ভরতে তিন ঘণ্টা সময় লাগবে শুনে।

ছবি শেষ হবার পর যখন আলো জ্বলে উঠলো, সাম্বু মাথা ঘুরিয়ে প্রজেকশন রুমের ফুটোর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইলো যেন ওর বাবা ওটার ভেতর মিলিয়ে গেছে। বাবা ছাড়া জগতটাকে আরো বিবর্ণ মনে হতে লাগলো। সে দৌড়ে বাড়ি ফিরলো। মা দরজায় ওর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। “নয়টা বাজে। অনেক দেরি করে ফেলেছিস।”
“ছবিটা আরো পরে শেষ হলে আমি বেশি খুশি হতাম। তুমি জেদী, মা। কেন তুমি ছবিটা দেখতে চাও না?”

রাতে খাবার সময় সারাক্ষণ সে বলতে লাগলো, “ঠিক যেভাবে বাবা গান গাইতো, ঠিক যেভাবে বাবা হাঁটতো, ঠিক যেভাবে…” ওর মা নিস্তব্ধ বসে শুনতে থাকলেন।

“তুমি কিছু বলছ না কেন, মা?”
“আমার কিছু বলার নেই।”
“তোমার কাছে কি ছবিটা ভালো মনে হচ্ছে না?”
তিনি প্রশ্নের উত্তর দিলেন না, জিজ্ঞেস করলেন, “তুই কি কালকে আবার ছবিটা দেখতে যেতে চাস?”
“হ্যা, মা, পারলে রোজই, যদ্দিন ওটা চলে। তুমি কি রোজ আমাকে চার আনা করে দেবে?”
“দেবো।”
“তুমি আমাকে রোজ দুইটা শো-ই দেখতে দেবে?”
“না, তা কী করে হয়, তোর পড়ালেখার কী হবে?”
“তুমি ছবিটা দেখতে যাবে না, মা?”
“না, সেটা সম্ভব না।”

পরের একটি সপ্তাহ সাম্বু দিনে তিন ঘণ্টা তার বাবার সান্নিধ্যে থাকতো, এবং শো শেষ হবার পর বিমর্ষ হয়ে পড়তো। ওর জন্য ব্যাপারটা ছিল রোজকার বিচ্ছেদ। ওর রাতের শো-টাও দেখতে ইচ্ছা করতো, কিন্তু মা স্কুল নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতো। সময় যে কত মূল্যবান সেটা মা বুঝতে চাইতো না। স্কুল বসে থাকবে, কিন্তু বাবা তো আর না। রাতের শো যারা দেখতো তাদের রীতিমত ঈর্ষা করতো সে।

সাম্বুর জোরাজুরির সামনে টিকতে না পেরে মা শেষপর্যন্ত শেষদিন ছবিটা দেখতে রাজি হলেন। ওরা রাতের শো দেখতে গেল। তিনি উইমেন্স ক্লাস-এ বসলেন। তাকে তাঁর সমস্ত সাহস জড়ো করতে হয়েছিল ছবি দেখতে বসার জন্য। বিজ্ঞাপন যতক্ষণ চললো ততক্ষণ তিনি নিশ্চিন্তই ছিলেন, কিন্তু ছবি শুরু হতেই তার হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল। পর্দায় তাঁর স্বামীকে দেখা যাচ্ছিল, ছবিতে তাঁর স্ত্রীর সাথে কথা বলছেন, বাচ্চার সাথে খেলছেন, গান গাইছেন, হাঁটছেন, জামা পাল্টাচ্ছেন— সেই একই জামা, একই কণ্ঠ, একই রাগ, একই রকম আনন্দ— তাঁর মনে হচ্ছিল যেন পুরো জিনিসটাই নিষ্ঠুরতা, তাঁর দিকে ছুড়ে দেয়া হচ্ছে। তিনি বেশ ক’বার চোখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ছবিটা তাকে আকর্ষণ করছিল— কষ্টকর কিছুর মাঝে যে আকর্ষণ থাকে। এরপর একটা দৃশ্য এলো যেখানে তিনি চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। কিভাবে তিনি মগ্ন হয়ে খবরের কাগজ পড়তেন! তাদের বিবাহিত জীবনে কতবার যে তিনি এই নিয়ে ঝগড়া করেছিলেন! এমনকি শেষদিনও রাতে খাবারের পর তাঁর ক্যানভাসের চেয়ারটায় খবরের কাগজ সামনে নিয়ে বসে ছিলেন, আর তিনি সেটা দেখে রেগে গিয়ে “তুমি আর তোমার কাগজ! আমিও গিয়ে বাকি দিন ঘুমিয়ে কাটাতে পারতাম” বলে চলে এসেছিলেন। পরে এসে দেখেন চেয়ার উল্টে পড়ে আছেন তিনি, মুখের উপর পত্রিকার পাতাগুলো…

এই দৃশ্যটা সহ্য করার মতো ছিল না। তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।

মেন্স সাইড-এ বসা সাম্বুর পত্রিকা পড়ার দৃশ্যটা খুব ভালো লাগতো কারণ একটু পরই মেয়েটা এসে বাবাকে জিজ্ঞেস করবে যে তিনি কী পড়ছেন, আর তারপর প্রশ্ন করে করে বিরক্ত করবে এবং শেষপর্যন্ত তা-ই পাবে যা ওর প্রাপ্য— বাবা চিৎকার করে উঠবেন, “কুমারী, তুমি বের হবে না আমি তোমাকে ছুঁড়ে বাইরে ফেলবো?”

মেয়েটা জানতো না বাবার সাথে কেমন ব্যবহার করতে হয়, সাম্বুর ভীষণ অপছন্দ ছিল ওকে…

অধীর আগ্রহে মেয়েটার ধমক খাওয়ার দৃশ্যের অপেক্ষা করতে করতে সাম্বু উইমেন্স ক্লাস-এ কান্না শুনতে পেল, সঙ্গে সঙ্গেই পায়ের আওয়াজ আর চিৎকার শোনা গেল, “বাতি জ্বালো! কারো কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে!” সিনেমা বন্ধ হয়ে গেল। মানুষজন এদিক-সেদিক সরে যেতে লাগলো। সাম্বু বিরতিতে বিরক্ত হয়ে কী হয়েছে দেখার জন্য একটা বেঞ্চের উপর উঠে দাঁড়ালো। ও দেখতে পেল ওর মাকে মাটি থেকে ওঠানো হচ্ছে। “এটা তো আমার মা! মাও কি মারা গেছে?” সাম্বু চিৎকার করে বেড়ার উপর দিয়ে লাফ দিলো। ও চেঁচিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিলো। কে একজন তখন ওকে বললো, “উনি অজ্ঞান হয়ে গেছেন কেবল, আর কিছু হয়নি। গোল করো না।” কয়েকজন তাঁকে উঠিয়ে বাইরে নিয়ে গিয়ে প্যাসেজে শুইয়ে দিলো। আবার আলো জ্বালানো হলো, সবাই যার যার সিটে গিয়ে বসলো আর সিনেমাও চলতে লাগলো। মা চোখ খুললেন, তারপর উঠে বসে বললেন, “চল্, আমরা যাই।”

“হ্যা, মা”— সাম্বু একটা জুটকা (ঘোড়া-টানা দুই চাকার গাড়ি)  নিয়ে এসে মাকে ওঠালো। সে নিজেও যখন উঠে বসছিল তখন অন্ধকার হল থেকে পরিচিত গলা বলছিল, “কুমারী, তুমি বের হবে না আমি তোমাকে ছুড়ে বাইরে ফেলবো?” সাম্বুর মন খারাপ হয়ে গেল, সে কান্নায় ভেঙে পড়লো। মায়ের বিপর্যয় ছাড়াও আরেকটা ব্যাপার তাকে আঘাত করেছিল: বাবার সাথে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ। ওরা পরদিন ছবিটা বদলে দিচ্ছিল।

(আর. কে. নারায়ণ—
ভারতের আন্তর্জাতিক ইংরেজি ভাষার লেখক আর. কে. নারায়ণের জন্ম ১৯০৬ সালে, চেন্নাইয়ে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘সোয়ামি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ সালে।

আর. কে. নারায়ণের গল্প-উপন্যাস বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৫৮ সালে তিনি ‘গাইড’ উপন্যাসের জন্য ভারতীয় সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

সাহিত্যে অবদান রাখার জন্য ১৯৬৪ সালে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত হন।  ২০০১ সালে জন্মভূমি চেন্নাইয়ে মারা যান তিনি।)

বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম
২৯.১০.২০১৩


Comments are closed.