>> জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩০ ডিসেম্বর : শিক্ষামন্ত্রী >> ইয়েমেনের রাজধানী সানায় আবার সৌদি বিমান হামলা নিহত ৩ >> হবিগঞ্জে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে ২ জন নিহত

বিচার

সাদেক চুবাক
অনুবাদ: ফজল হাসান

Trialপ্রশস্ত এক জলাশয়ের পাশের সরু রাস্তা থেকে চলন্ত ঘোড়ার গাড়ি উল্টে পড়ে যায় পানিতে। ঘোড়ার সামনের পায়ের হাঁটু এবং হাঁটুর উপর ঢাকনা দেওয়া চামড়ার টুপি দুমড়েমুচড়ে গেছে। সামনের যে পা-টা হাঁটুর নিচে ভেঙেছে, সেই পায়ের থেঁতলে যাওয়া চামড়া ও মাংসের ফাঁকে রক্ত দেখা যাচ্ছে এবং পায়ের খুর বাইরের দিকে হা করে আছে। এছাড়া পা-টা ভেতরের মাংসপেশি এবং শিরার সঙ্গে ঝুলে আছে। পায়ের তিন আঙুলের সঙ্গে কোনো রকমভাবে লেগে থাকা মুখে পরানো জীর্ণ,  অথচ চকচকে চামড়ার মুখসাজ দেখা যাচ্ছে।

ঘোড়ার শরীরের চারপাশে যেখানে তাজা রক্তের উষ্ণতা, শুধু সেই জায়গার বরফ গলে গেছে। তবে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বাকিসব জায়গার পানি জমে বরফ হয়ে আছে। রক্তমাখা কর্দমাক্ত পানিতে ঘোড়ার পুরো শরীর পড়ে আছে। ঘনঘন নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার সময় ওর নাকের ছিদ্র একবার স্ফীত হচ্ছে, আরেকবার সংকুচিত হচ্ছে। দাঁতের ফাঁক গলিয়ে জিহ্বার অর্ধেকটা বেরিয়ে এসেছে। মুখের চারপাশে ফেনায়িত রক্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঘোড়ার ঘাড়ের কেশরের নাজুক অবস্থা দেখলে অনুশোচনায় সবার মন নিঃসন্দেহে খারাপ হবে। দুজন রাস্তার ঝাড়ুদার এবং একজন ক্লান্ত-অবসন্ন পথচারী জলাশয় থেকে আহত ঘোড়াটি তোলার জন্য যারপরনাই চেষ্টা করছে।

ঝাড়ুদারদের মধ্যে একজন, যার হাত মেহেদী রঙে রাঙানো, বললো, ‘আমি ওর লেজ ধরবো এবং তোমরা দুজন একটা করে পা ধরো । আমরা একসঙ্গে ওকে উপরে টেনে তুলবো। যেহেতু ও নিজে থেকে দাঁড়াতে পারবে না, এমনকি পা সোজা করতে পারবে না, তাই সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিতে চাইবে। তখন চট জলদি তোমরা পা ছেড়ে দেবে এবং আমিও লেজ ছেড়ে দেবো। নিশ্চয়ই তখন তিন পায়ের উপর ভর দিয়ে ঘোড়া দাঁড়াতে পারবে। ভাগ্যিস, সামনের পা-টা সম্পূর্ণ ভাঙেনি। মোরগ-মুরগি দু’পায়ে ভর করে দাঁড়াতে পারে, ঘোড়া কেনো তিন পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারবে না?’

একজন ভদ্রলোক, যে বগলের নিচে বাদামি রঙের চামড়ার ব্যাগ ধরে আছে এবং চোখে রঙিন চশমা পড়েছে, বললো, ‘এভাবে কেমন করে ওকে তোমরা তুলবে? অনেকে মিলে একসঙ্গে উপরে তুলে রাস্তার পাশে রাখতে হবে।’

একটা বাচ্চা ছেলের হাত ধরে রাখা আরেকজন পথচারী অনুযোগ করে বললো, ‘এই হতভাগাটা সুস্থ হলেও মালিকের জন্য কখনই ভালো ঘোড়া হবে না। বরং ওকে গুলি করে মেরে ফেলা উচিত।’

সেই সময় রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে দুর্বল এক পুলিশ গাজর খাচ্ছিল। লোকটি তার কাছে গিয়ে বললো, ‘অফিসার, আপনার কাছে পিস্তল আছে। তাহলে কেনো হতভাগাটাকে এমন কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে? আসলেই বেচারা খুব কষ্ট পাচ্ছে।’

মুখের ভেতর অর্ধ চিবানো গাজর নিয়ে উপহাসের ভঙ্গিতে পুলিশ বললো, ‘নিশ্চয়ই তুমি আমার সঙ্গে মশকরা করছো।’

বলেই সে কয়েক পলকের জন্য থামলো। তারপর মুখের গাজর শেষ করে গম্ভীর গলায় বললো, ‘প্রথমত, এই বুলেট ঘোড়া মারার জন্য নয়, বুঝলে? এগুলো হলো চোর-ডাকাত মারার জন্য। দ্বিতীয়ত, মনে করো তোমার কথামতো আমি ওকে এই কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি দিলাম, এবং আরো মনে করো যে কেয়ামতের দিন এই বুলেটের জন্য আমাকে কোনো জবাবদিহি করতে হবে না, কিন্তু সরকারের কাছে আমি কি কৈফিয়ত দেবো? তারা তো আমার কাছে বুলেটের হিসেব চাইবে। কি, চাইবে না?’

মাথায় পাগরি বাঁধা মৌলভী, যার কাঁধের উপর চাদরের মতো ছেঁড়া ভেড়ার চামড়া ঝুলে আছে, বললো, ‘এখন চলো যাই। জানোয়ারটা ঠিক আছে। অযথা ওকে মারার কোনো কারণ নেই। আগামীকালই ভালো হয়ে যাবে। গাছের কষ লাগালে ও সুস্থ হয়ে উঠবে।’

খবরের কাগজ হাতে নিয়ে অন্য এক কৌতূহলী আগুন্তুক জিজ্ঞেস করে, ‘কি হয়েছে?’
ভিড়ের মাঝে মুখে সিগারেট নিয়ে একজন বললো, ‘আমি এ জায়গায় বসবাস করি না। এ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম।’

এক কোণায় দাঁড়িয়ে খদ্দেরদের জন্য হাতল ছাড়া চাকু দিয়ে গাজরের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বিক্রেতা বললো, ‘তেমন কিছুই হয়নি। একটা গাড়ি ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়েছে। বেচারা ঘোড়া কাল মধ্যরাত থেকেই পানিতে পড়ে আছে এবং মৃত্যুর সঙ্গে বোঝাপড়া করছে। ওর জন্য কেউ মোটেও উদ্বিগ্ন নয়। কেউ কি বলবে …।’

কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই গাজর বিক্রেতা একজন খদ্দেরকে বললো, ‘মাত্র এক রিয়াল।’
বলেই সে অন্য খদ্দেরদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘এই মিষ্টি এবং সুস্বাদু গাজরের জন্য কোনো কুপন লাগবে না। এক সেরের মূল্য মাত্র এক রিয়াল।’
হাতে খবরের কাগজওয়ালা লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করে, ‘তাহলে, কেউ এখনো ওকে দাবি করেনি?’

শক্ত সবল একজন লোকের, হয়তো ড্রাইভার হবে, পরনে চামড়ার জ্যাকেট এবং গলায় সবুজ রুমাল বাঁধা। সে বললো, ‘অবশ্যই ওর দাবিদার আছে। মালিক ছাড়া কি কিছু আছে? নিদেন হলেও ওর চামড়ার দাম পনের টোম্যান হবে। এই একটু আগেও গাড়ির চালক এখানে ছিল। আমার মনে হয় গাড়িটা রাখতে সে কোথাও গেছে। হয়তো এক্ষণই এসে পড়বে।’

যে বাচ্চা ছেলেটা একজন লোকের হাত ধরেছিল, সে মাথাটা উপরের দিকে সামান্য তুলে বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘আব্বাজান, লোকটি কেমন করে ভাঙা গাড়ি নিয়ে চলে গেল? তাহলে কি ঘোড়া মারা যায়নি?’

চশমা চোখে একজন ধোপদুরস্ত ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করে, ‘ওর কি শুধু সামনের পা ভেঙেছে?’
পরনে চামড়ার জ্যাকেট এবং গলায় সবুজ রুমাল বাঁধা শক্ত সবল লোকটি জবাবে বললো, ‘ঘোড়ার গাড়ির চালক বলেছে, তারও হাঁড় ভেঙেছে।’

নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় ঘোড়ার নাকের ছিদ্র দিয়ে হালকা গরম বাষ্প বেরিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে ওর সমস্ত শরীর থেকেই যেন বাষ্প নির্গত হচ্ছে। থেঁতলানো চামড়ার নিচে হাঁড় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পিঠের উপর ছড়িয়ে থাকা কর্দমাক্ত পাঁচ আঙুলে রক্তের দাগ শুকিয়ে গেছে। ঘাড়ের কাছে এবং শরীরের কয়েক জায়গায় শুকনো মাটির দাগ লেগে আছে। চামড়ার কয়েক স্থানে মৃদু কম্পন দেখা যাচ্ছে।

আচমকা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে ঘোড়াটির সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে। চাপা গোঙানির কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। ওর শান্ত ভঙ্গিতে কোনো ধরনের অনুযোগ কিংবা মিনতির লেশমাত্র চিহ্ন নেই। তবে ওর চোখেমুখে ফুটে উঠেছে একটা তরতাজা এবং স্বাস্থ্যবান ঘোড়ার প্রতিচ্ছবি, যে কিনা অবাক বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে আশেপাশের লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে।

গল্পসূত্র: ‘বিচার’ গল্পটি সাদেক চুবাকের ইংরেজিতে ‘জাস্টিস’ গল্পের অনুবাদ। গল্পটি ফার্সিতে ‘দ্য পাপেট শো’ গল্প সংকলনে অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীতে ইংরেজিতে গল্পটি অনুবাদ করেছেন ইরাজ বাশিরী।

সাদেক চুবাক: ইরানের ফার্সি কথাসাহিত্যের কীর্তিমান লেখক, নাট্যকার, কবি এবং অনুবাদক সাদেক চুবাক ১৯১৬ সালে ইরানের বুশায়ার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছে বুশায়ার এবং সিরাজ শহরে। পরবর্তীতে তিনি তেহরানে পড়াশুনা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তেহরানে ইরানি সৈনিকদের ইংরেজি ভাষার অনুবাদক ছিলেন তিনি। পরে ১৯৪৯ সালে তিনি ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানিতে চাকুরি নেন। তার প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘দ্য পাপেট শো’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে এবং তখনই তিনি ইরানের প্রথিতযশা সাহিত্য সমালোচকদের নজরে আসেন। ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় গল্প সংকলন (‘দ্য মাঙ্কি হুজ মাস্টার ওয়াজ ডেড’)। তারপর প্রায় পনের বছর পর প্রকাশিত হয় তার তৃতীয় (‘দ্য ফার্স্ট ডে ইন দ্য গ্রেভ’, ১৯৬৫) এবং চতুর্থ (‘দ্য লাস্ট আমজ্’) গল্প সংকলন। ‘দ্য পেইশ্যান্ট স্টোন’ (১৯৬৬) তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এছাড়া তিনি ‘দ্য রাবার বল’ এবং ‘স্লাই’ নামক দু’টি নাটক রচনা করেন। বলা হয়, সাদেক চুবাকের লেখায় আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, উইলিয়াম ফকনার এবং হেনরি জেমসের প্রভাব রয়েছে। শেক্সপিয়রের ‘ওথেলো’ সহ রোনাল্ড এবং বালজাকের লেখা তিনি ফার্সিতে অনুবাদ করেছেন। ১৯৯৮ সালের জুলাইয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার এক হাসপাতালে সাদেক চুবাক মৃত্যুবরণ করেন।

বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম
২৯.১০.২০১৩


Comments are closed.