>> জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩০ ডিসেম্বর : শিক্ষামন্ত্রী >> ইয়েমেনের রাজধানী সানায় আবার সৌদি বিমান হামলা নিহত ৩ >> হবিগঞ্জে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে ২ জন নিহত

স’তে সাপ স’তে সালাউদ্দিন

আকতার হোসেন

Akhtar Hossain‘কিসের মুক্তিযুদ্ধ? মুক্তিযুদ্ধ কি নুন দিয়া মাখাইয়া খামু? সংসারে ভাত নাই, চিকিৎসার পয়সা নাই, কথায় কথায় খালি মুক্তিযুদ্ধ’।

বারেক মিয়ার স্ত্রীর যক্ষ্মা হলে কি হবে ইদানীং সে এভাবেই চিৎকার করে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ১৩ নম্বর টিনসেডের নিচে সেতারা বেগমের ভাঙ্গা রেকর্ড ভাওয়াইয়া হয়ে বাজতে থাকে। মাথা নিচু করে এসব কথা না শুনে বারেক মিয়ার কোন উপায় থাকে না। ইচ্ছে করলে সে বলতে পারে আমিতো পাশে থাকি এতো চিৎকার করার কি আছে। তাছাড়া রোজইতো এক কথা বল, এক কথা আর কত ভাল লাগে। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলে খারাপ হত না তবে স্ত্রীকে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করে না বারেক মিয়া। এদিকে সেতারা বেগমের চেঁচামেচি একদিন পৌঁছে যায় স’তে সাপ স’তে সালাউদ্দিনের লোকজনের কাছে। তারা ওঁত পেতে থাকে বারেক মিয়াকে কিভাবে খাঁচায় বন্দী করবে।
বাইরের থেকে মনে হবে পিঁয়াজ রসুনের গুদাম। কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠতেই দেখা গেল সাজানো গোছান একটি অফিস। চেয়ার টেবিল কম্পিউটার সবই আছে তবে ঝামেলা হল অফিস পর্যন্ত পৌঁছাতে কিছু বীভৎস জিনিষ দেখে আসতে হয়েছে। দেশি অস্ত্র, জমাট রক্ত, মদের বোতল, নেশায় বুদ হয়ে থাকা কিছু লোক। সবচেয়ে খারাপ লাশ পচা গন্ধ। এসব কারণে বারেক মিয়ার শূন্য পাকস্থলীতে ঢেউ উঠেছিল কয়েকবার, লাল হয়ে গিয়েছিল তার মেঘলা দুটি চোখ। রোগা পাতলা হলে কি হবে বুকে এখনো অনেক সাহস। বাতাস কেটে যখন হাটতে থাকে মনে হয় কালের কোন বাধনে সে বাঁধা পড়ে নাই। একাল-সেকাল সব কালের গ্রহণযোগ্য একটি উপস্থিতি বারেক মিয়ার চোখের ভেতর। এ ছাড়া গর্ব করার মত তার থলিতে রয়েছে অমূল্য রতন। সে একজন মুক্তিযোদ্ধা। প্রথমে ভেবেছিল গুণ্ডা পাণ্ডারা ভুল করে চাঁদা চাইতে ডেকে এনেছে অথবা বস্তি থেকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র। তাই চড়া গলায় কিছু কথা শুনিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল। কাজের কাজ তেমন কিছু হয়নি উল্টো স’তে সাপ স’তে সালাউদ্দিনের অফিসের কর্মচারীদের অনৈতিক আচরণে তার উত্তেজনা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। রাগে কটমট চেহারা তবুও সাহস করে কিছু বলতে পারছে না।
এমন সময় লম্বা একটা লোক এসে বলল
‘ভাইসাব কি নামাজ রোজা করেন’?
বারেক মিয়া মাথা দুলিয়ে হা সূচক জবাব দিল। কতক্ষণ চুপ থেকে লোকটি বলল
‘মোনাজাত কি ভাবে করে, দিখাবেন’।
বারেক মিয়া লোকটাকে আরেকবার দেখল, আগে কখনো দেখেছে বলে মনে হল না। বাংলা উচ্চারণে দোষ আছে। এমন বেঢক উচ্চতার লোক কোন দেশ থেকে আসতে পারে? পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চলের লোক বাংলাদেশে বসবাস করছে বারেক মিয়া সে কথা চিন্তা করতে করতে মোনাজাত করে দেখাল। ঠিক তখন বারেক মিয়ার হাতের উপর ভারি একটা জিনিস রেখে লোকটি বলল,
‘আপনার মুনাজাত কবুল হয়ে গেছে। এই টাকা সংসারের কাজে খরচা করবেন। বউ’র চিকিৎসা করাইবেন। নাতী দুইটারে ভাল ইশকুলে লেখা পড়া শিখাইবেন। আরো টাকা লাগলে বলবেন লজ্জা করবেন না।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু টাকা গুঁজে দেয়া হল বারেক মিয়ার হাতে। টাকার গায়ে এতো ওজন এই প্রথম বারেক মিয়া সেটা বুঝতে পারল। যেন পিতল দিয়ে বাঁধানো টাকা। যে নেতার অফিসে তাকে আনা হয়েছে সেই নেতার ছবি ঝুলে আছে দেয়ালে। তার ছবি দেখার পর বারেক মিয়ার দাঁতের নিচ দিয়ে ক্ষণেক্ষণে হাড়ভাঙ্গা শব্দ হতে শুরু করেছে। লোকটির চেহারা অনেক বদলে গেলেও বারেক মিয়া তাকে ঠিকই চিনতে পেরেছে। কি করবে বুঝে উঠতে না পেরে সে এক গ্লাস পানি খেতে চাইল। পানি খেতে পারলে এক সঙ্গে দুটো লাভ। টাকার ওজন সে আর ধরে রাখতে পারছিল না একটু জিরিয়ে নিতে পারবে তাছাড়া সেই ফাঁকে পালাবার কিছু বুদ্ধি বের করবে। নেতা এলো না কিন্তু তার পক্ষে থেকে এক সুন্দরী মহিলা এসে বলল
‘নেতা আসতে পারছেন না তিনি অন্য মক্কেল নিয়ে ব্যস্ত। আপনাকে তিনি অনুরোধ করেছেন কোনদিন মুখ খুলে কাউকে যেন না বলেন আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। যা বলার যে ভাবে বলার আমরাই বলব। এই একটাই মাত্র শর্ত। এবার আপনি যেতে পারেন। মাঝে মাঝে আমাদের মিটিং মিছিলে যোগ দিলে আমরা খুশি হব’।
টাকার অঙ্ক খালি রেখে টাইপ করা কাগজে কতগুলো সই নিয়ে ছেড়ে দেয়া হল বারেক মিয়াকে। শর্ত ভঙ্গ হলে শূন্য স্থান পূরণ করে যত টাকা দাবী করা হবে ফেরত দিতে হবে সুদে-আসলে । পরিবারের উপর অত্যাচার জুলুম গুম সেসব ঘটা করে বলতে হল না। অফিস ঘরে আসার পথেই বারেক মিয়ার বুদ্ধি খুলে গেছে। একটি অর্ধ উলঙ্গ মেয়ের কোলে বসিয়ে ছয় সাতটা ছবি তোলা হয়েছিল। মহিলা সেক্রেটারি ছবিগুলো বারেক মিয়ার ফাইলে রেখে দিতে গিয়ে বলল
‘বেশ সুন্দর ছবি উঠেছে, দেখেন আপনাকে কেমন মানিয়েছে ওর সাথে’।
বারেক মিয়া ছবির দিকে না তাকিয়ে ঝকঝকে ফ্লোরের দিকে চোখ গুঁজে দাঁড়িয়ে রইল। সেখানে তার একক একটি ছবি ভেসে উঠেছে। মনে হয় ছবিটি লম্বা হয়ে তাকেই স্পর্শ করতে চাইছে যা দেখে বারেক মিয়ার সাহস অনেকটা বেড়ে গেল । সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বস্তির চুলাগুলো এক সাথে জ্বলে উঠে বাতাসে ভোজন বিলাসের জানান দিচ্ছে। রান্না বান্নার তেমন কিছু না থাকলেও বারকে মিয়ার স্ত্রী সারাক্ষণ রান্না ঘরেই বসে থাকে। একটা গ্যাসের চুলায় আলু পটোল কচুর লতি এক সাথে মিশিয়ে সন্ধ্যার পর তার বিখ্যাত সবজীর ঘ্যাঁট রান্না করছিল সেতারা বেগম। ঠিক তখন বারেক মিয়া কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে সেতারা বেগমের পাশে চুপচাপ বসে পড়ল। দুজন দুজনকে ত্রিশ বছর থেকে চিনে কিন্তু ইদানীং সরাসরি কথা না বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাশাপাশি বসে থাকে। রান্নার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বারেক মিয়া এভাবেই বসে থাকবে হয়তো। হয়তো সেই ফাঁকে একটা সিগারেট শেষ করে দিতে পারত অথচ আজ নিয়মের কিছুটা ব্যতিক্রম হল। পকেট থেকে সিগারেট বের করল ঠিকই তবে সেতারা বেগমের কাছে আগুন চাইল না। দু চারটা অহেতুক কাশি দিয়ে দুপুরের ঘটে যাওয়া ঘটনা বলতে শুরু করল। কিছু কথা গোপন করে কিছু কথা বানিয়ে বললে কেউ সত্য মিথ্যা বুঝতে পারত না কিন্তু থেমে থেমে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে গেল বারকে মিয়া। অর্ধ উলঙ্গ মেয়েটির কথাও বলল। তারপর একটা কাগজে মোড়ান টাকার বান্ডিল সেতার বেগমের দিকে তুলে দিয়ে বলল
‘টাকাগুলা ধরলেই বুঝতে পারবা একটাও নকল টাকা নাই’।
এবারো তার কাছে মনে হল পিতল দিয়ে বাধানো টাকা অথচ সেতারা বেগম এমন সোঁ মেরে টাকার বান্ডিলটা নিয়ে নিলো যেন এক গ্রাম তেজপাতা।
সেতারা বেগমের সবজীর ঘ্যাঁট থেকে কাঁচা হলুদের গন্ধ আসতে শুরু করেছে। শুকনো মরিচও পড়েছে বেশি মনে হচ্ছে খেতে খুব সুস্বাদু হবে।
অন্য কিছু রান্না করার নেই তবুও পাশের চুলাটা সন্ধ্যা থেকেই জ্বলছিল। শীতকালে যতটুকু উত্তাপ সেতারা বেগম পায় সেটা আসে পাশের খালি চুলা থেকেই। সাত পাঁচ না ভেবে টাকার বান্ডিল সেই চুলার উপর ছুঁড়ে মেরে সবজী নাড়তে মন দিল সেতারা বেগম। যেন সবজী পুড়ে গেলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে অথচ বাংলাদেশ সরকারে এতোগুলো নোট পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে তার দিকে সে ফিরেও তাকাল না।
বারেক মিয়া তার প্রিয়তমার দিকে তাকিয়ে আবারো তাকে আবিষ্কারের চেষ্টা করে। এই সেতারা বেগমই অভাবের কষ্ট সইতে না পেরে একদিন রেল লাইনের উপর মাথা দিয়ে শুয়েছিল। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি গিয়েও সে ফিরে এসেছিল ভালবাসার মানুষটার জন্য। অভাব তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী তবুও এক সময় অভাবের কাছে তার আত্মসমর্পণ হয়।
ছেলেবেলা থেকেই অল্প খেয়ে পরে ওরা মানুষ হয়েছে। সেতারা বেগমের সাথে বারকে মিয়ার বিয়ে হয়েছিল মিষ্টি মুখ করে। বিয়ের সময় সেতারা বেগমের কোমরের নিচে ছিল গোছা বাঁধা চুল। দাঁতগুলো ছিল বক পাখির মত সাদা। খুব মিল ছিল দুজনের। বারেক মিয়াকে সারাক্ষণ কাছে কাছে রাখতে কোন গল্পই সেঁতারা বেগম একবারে শেষ করতো না। এক গল্পের অর্ধেক বলে শুরু করত অন্য গল্প। বারেক মিয়া এক সময় মিটিং মিছিল ছেড়ে সেতারা বেগমের অসমাপ্ত গল্পের ভক্ত হয়ে যায়। কখন যে তাদের গল্পের আসর ভেঙে গেল কেউ বলতে পারবে না। এখন শুধু পুরানো দিনের গল্প নিয়ে গল্প করে কাটায়। অনেক দিন পর আবারো সেই ভালোবাসার গল্প ১৩ নং টিনসেডের নিচে ঠং ঠং করে বেজে উঠল এই ভাবে,
‘মোস্তফার মা, পোড়া কাগজের গন্ধে তোমার কাশি আরো বাইরা যাইব। তুমি ভিতরে গিয়া বস, দাও খুন্তিটা আমারে দাও – বাকিটা আমি পারুম’।
ঘর থেকে বের হলে দু’চার জন পরিচিতি লোকের সাথে দেখা হওয়া স্বাভাবিক। তাদের মধ্য সেলিম শেখ, আকরাম মোল্লা, কাদের মিয়া, নাসের ভাই এবং মন্টুও থাকে। তারাও বারেকে মিয়ার মত মুখ বুজে চলাফেরা করে। কেউ কাউকে কিছু বলে না তবুও অঘোষিত স্বীকারোক্তি থাকে সকলের চোখে। ওদের আড্ডায় আকরাম মোল্লা প্রায়ই বই পত্র নিয়ে আসে, কিছুটা বাম রাজনীতিতে ঝুঁকে আছে সে। আকরাম মোল্লার মতে মেঘলা আকাশ আর বাদলা দিনের মত সামনে আসছে ‘বোবা মুক্তিযোদ্ধা’ ফর্মুলা। সে আরো বলে,
‘এই ফর্মুলা এক পা দুই পা কইরা আগাইয়া আসতেছে। যাদের পরিকল্পনায় এ কাজ হচ্ছে তাদের কেউ টুপি পড়লে বলা যাবে না মাথায় টুপি ছিল। দাড়ি থাকলেও বলা যাবে না দাড়ি ছিল। নতুন ফর্মুলা চালু করা মানুষগুলো দেখতে কেমন তার চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা দুষ্কর। পায়জামা পাঞ্জাবি শেরওয়ানি টুপি দাড়ি কিছুই বলা যাবে না তাই মনে করে নিতে হবে লোকগুলো বিবস্ত্র। বিবস্ত্র তবুও তাদের শরীরের মিশে আছে দুচারটা পকেট। সেখানে রাখা থাকে ভারী ভারী টাকার বান্ডিল’।
আকরাম মোল্লার কথা শুনে বারেক মিয়া শিউড়ে উঠে। কিছুটা লজ্জা কিছুটা দংশনের জ্বালা নিয়ে ভাবতে থাকে মেগাজিনের গুলি শেষ না হলে সেদিন সালুর লাশ নদীতে ভেসে থাকতো। সালু কি মনে করছে আমি তারে হুদামিশা ধাওয়া কইরা পালাইয়া যাইতে দিছি। হাতে টাকা গুইজা দিয়া সালু কি ঋণ শোধ করল? একবার দেখা পাইলে কথাটা সামনা সামনি জিগানো যাইত।
মনে হয় কিছুদিন আগের কথা। লাল রঙের শাল জড়িয়ে লঞ্চ ঘাটে এর ওর কাছে হাত পাতত বলে ওর নাম হয়েছিল ‘সালু’। অচেনা অনাথ তবুও গ্রামবাসীর মায়া বসে যেতে লাগল ছেলেটার প্রতি। অনেক দিন আগে ওর বাবা-মা নদীর কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। হয়তো কিছু কেনা কাটা বা বিশ্রামের জন্য থেমে ছিল কিছুক্ষণ কিন্তু তাদের ছেলে যে ঘাটে পড়ে ছিল সে কথা খেয়াল রইল না কারো। অথবা ইচ্ছে করেই লোক সমাগমে ছেলেটাকে রেখে গিয়েছিল যেন খাবারের অভাবে তার মৃত্যু না ঘটে। সালু’র লিকলিকে শরীরে যখন দাড়ি মোচ উঠতে শুরু করল তখনই বদলে গেল তার ভাগ্য। সময়টা একাত্তর। তখন গ্রামে গঞ্জে যমদূতের মত পাকিস্তানি মিলিটারি আসত।
মিলিটারির নাম শুনে লোকজন পালিয়ে যেত যে যার মত। ভীষণ ছাড়াছাড়া জীবন আর অনিশ্চিত দিনরাত। প্রতিটি দিন ছিল হাজার দিনের সমান। কেউ কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারত না। কেউ থাকুক বা নাই থাকুক লঞ্চ ঘাট থেকে এক চুলও নড়ত না সালু। মিলিটারিদের অন্যায় অত্যাচারের খবর তার কাছে মনে হত রূপকথার গল্প। যে মিলিটারির এত ক্ষমতা সেই মিলিটারিকে এক নজর না দেখে সালু মরতেও রাজি ছিল না। সত্যি সত্যি একদিন তার কাঙ্ক্ষিত রূপকথার মিলিটারি এলো লঞ্চ ঘাটে। কোথা থেকে বুদ্ধি এলো কে জানে, বলতে মানা সেই গোল জিনিসটা মাথার উপর চড়িয়ে গান বোটের দিকে এগিয়ে এলো সালু। বেশ কাজ হল তাতে। প্রথমে গুলির বাক্স টানানো হল তারপর গ্রামের পথ দেখিয়ে দেবার মত কাজে যোগ দিল সে। এছাড়াও মিলিটারিদের হাত পা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ মালিশ করার কাজ করত আনন্দের সাথে। তাদের সাথেই খাওয়া দাওয়া তাদের বিছানাই ঘুমত। সকাল বেলা মিলিটারিদের সাথে ষাঁড়ের মত গলা মিলিয়ে সেও গাইত ‘পাক সার জামিন সাদ বাদ’।
পাকিস্তানি মিলিটারির সমর্থন পেয়ে সালু এক সময় বিষধর সাপ হয়ে উঠেছিল। যাকে ইচ্ছে তার উপর ছোবল দিত সে এবং সেই ক্ষমতা নিয়ে ছোট্ট একটা সাম্রাজ্যও গড়ে তুলেছিল সালু। টিনের ঘর দুধের গরু থেকে শুরু করে ভয়ে নীল হয়ে থাকা নোলক বালারা সালুর পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পরত। তারপর যাকে যেটা খুশি সে দান খয়রাত করত এবং পূর্ব থেকে নীল হয়ে থাকা মুখে সে নতুন করে বিষ ঢেলে দিত। নতুন ক্ষমতার কারণে তার এক শব্দের নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিল। প্রথমে সালু থেকে সালাউদ্দিন তারপর এক মুরব্বির ইচ্ছায় তার নাম হয়ে যায় সালাউদ্দিন আহমেদ। এক দিন মনে পড়ে গেল একাত্তরে যাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ মালিস করে দিত তাদের মধ্যে সবচাইতে পেয়ারা যিনি ছিলেনে সেই মিলিটারির নাম ছিল বুড়কি খান। খান শব্দটি প্রথম থেকেই তার কাছে মনে হয়েছিল অতি আধ্যাত্মিক শব্দ। সঙ্গত কারণে সালাউদ্দিন আহমেদর সাথে খান শব্দটি যোগ হয়ে গেল। সেই থেকে তার নাম ‘সালাউদ্দিন আহমেদ খান’। নামের অধিকার তত্ত্ব সে মানে না আরো মানে না ইজ্জত বেইজ্জতের ভয়।
নিজের ইচ্ছায় সে চলে এবং দেশের নিয়ম নীতির গোঁড়ায় থুতু মেরে এগিয়ে যায় সমাজের চুম্বক মিনারে। একটি সম্পূর্ণ নাম তাকে সম্পূর্ণ ক্ষমতাশালী করে তুলল অল্পদিনের মধ্যে। অধিকাংশ লোক তাকে সালাউদ্দিন আহমেদ খান নামে চিনলেও সেলিম শেখ, আকরাম মোল্লা, কাদের মিয়া, নাসের ভাই, মন্টু এবং বারেক মিয়া তাকে ডাকে স’তে সাপ স’তে সালাউদ্দিন। সালাউদ্দিনের বর্তমান সয়-সম্পত্তির হিসেব করা কঠিন কেননা বেশির ভাগ টাকা-পয়সা আসে বিদেশ থেকে। সেই টাকায় চলে বোবা মুক্তিযোদ্ধা ফর্মুলার অভিযান। অভিনব পন্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের মুখ বন্ধ করার সাফল্য দেখে সালাউদ্দিনের উপর অনেকের বিশ্বাস বেড়ে গেছে। যাদের হয়ে সে কাজ করে তারাতো তাকে বড় বড় সুবিধা করে দিচ্ছেই, এছাড়া সরকারি দল বিরোধী দলও তার সাথে যোগাযোগ রাখে। মিনিস্টার এমপি উপদেষ্টা এই সমস্ত হোমরা চোমড়াদের সান্নিধ্য এক সময় তার খুব ভাল লাগত। দুজন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিও চব্বিশ ঘণ্টা দরজা খুলে রাখে তার জন্য। অনেকের সাথে ফ্রেম বাঁধানো ছবি আছে সালাউদ্দিনের কাছে কিন্তু আর কত পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা যায় তাই ভেবে চিন্তে ঠিক করেছে এবার সে ইলেকশন করবে এবং ছবির কেন্দ্র বিন্দুতে চলে আসবে। ভাবতেই পুলক লাগার কথা। স’তে সাপ স’তে সালাউদ্দিন।
ইলেকশন কমিশন থেকে একটা স্বতন্ত্র মার্কা পাবে। হাতি ঘোড়া বানর দেয়া হবে অন্যদের সে হয়তো অজগর সাপ মার্কা দাবী করে বসবে। কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশের ভোটাররাও সাপ’কে বন্ধু ভাবতে শুরু করে সাপকে বলবে ভাই। আমার ভাই তোমার ভাই বলে সাপ ভাইয়ের নামে শ্লোগান দিবে। যে হাতে এক সময় মালিশের তেল লেগে থাকত ঘরে ঘরে গিয়ে সেই হাত দিয়ে সে করমর্দন করবে। চমৎকার সেই দিনগুলোতে সাপের মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে মা চাচিরা এবং সেই দৃশ্য সকলের কাছে পৌঁছে দিবে ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া।
ইলেকশন যত এগিয়ে আসবে ততোই সাপের ছবি মাটি থেকে দশ হাত উঁচুতেও উড়তে থাকবে। বাংলাদেশের পতাকা আর সাপ হবে মুখোমুখি। গণতন্ত্রের সুবাদে সালু একজন মাননীয় সাপ হয়ে যাবে। সুযোগ পেতেই মহামান্য সাপ কোন টকশোতে গিয়ে প্রফেসার কিংবা সম্পাদক সাহেবদের সাথে করমর্দন করে দেশ নিয়ে ভাল মন্দ কথা বলবে। হয়তো তাকে প্রশ্ন করা হবে দেশ সম্পর্কে, তখন সে দম ফাটানো হাসির ইতিহাস শুনিয়ে দিবে। মুখ ফসকে বলে দিতে পারে পাকিস্তানি মিলিটারিদের শরীর থেকে কর্পূরের গন্ধ আসত। ভীষণ লোমশ হতো তাদের শরীর। কিছু লোক এই তথ্য শুনে ভাবতে থাকবে কুদরতি ব্যাপার। তারা হয়তো কোমর কষে নেমে পরবে ইলেকশনে। বাংলাদেশে কর্পূর প্রেমিকদের দল অনেক দিন থেকেই তৈরি হয়ে আছে শুধু নাড়াচাড়া পেলেই স’তে সাপ স’তে সালাউদ্দিনের মত লোকদের সাথে তারাও ঝাঁপিয়ে পড়বে।
ইলেকশন যত এগিয়ে আসবে সাপদের মিছিল ততোই বড় হতে থাকবে। হয়তো সেই সব মিছিলে কর্পূর প্রেমিকদের পেছনে থাকতে বাধ্য করা হবে সেলিম শেখ, আকরাম মোল্লা, কাদের মিয়া, নাসের ভাই, মন্টু এবং বারেক মিয়াদের। এদের ছাড়া মিছিল কি এক পাও এগুবে? স’তে সাপ স’তে সালাউদ্দিনই শুধু নয়, এদেরকে অনেকেই মিছিলে দেখতে চায়। প্রতিদিন নাম না জানা কত সেলিম শেখ, আকরাম মোল্লা, কাদের মিয়া, নাসের ভাই, মন্টু কিংবা বারেক মিয়াদের বোবা করে দলে টানা হচ্ছে সে খবর কে রাখে। ওদের ফেসভেলু কাজে লাগান এখনই মক্ষম সময়।

বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম
২২.১০.২০১৩


Comments are closed.