>> জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩০ ডিসেম্বর : শিক্ষামন্ত্রী >> ইয়েমেনের রাজধানী সানায় আবার সৌদি বিমান হামলা নিহত ৩ >> হবিগঞ্জে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে ২ জন নিহত

কাঁটাতার

অনুরূপ আইচ

Barbed wire fantasyছেলেটাকে নিয়ে চিন্তার শেষ নেই শায়লা বেগমের। তার স্বামী আফজাল চৌধুরী গত হয়েছেন প্রায় বিশ বছর আগে। তখন রঞ্জুর বয়স ছিল পাঁচ। পরে আর বিয়ে থা করেননি শায়লা বেগম। বিয়ের আগে থেকেই একটা কর্পোরেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন তিনি। ভালো পোস্ট ছিল। মাইনেও ছিল ভালো। গত পঁয়ত্রিশ বছরে তিনি চাকরি পরিবর্তন করেননি। এর মাঝে আরও অনেক ভালো ভালো প্রতিষ্ঠান থেকে তার কাছে চাকরির প্রস্তাব এসেছিল। যাননি তিনি। এক জায়গাতেই পড়ে ছিলেন। তার ভালো ফলও পেয়েছেন। এখন তিনি সেই কোম্পানির কান্ট্রি ডিরেক্টর।
এত কিছুর পরও তার মনে শান্তি নেই। রঞ্জু তার একমাত্র সন্তান। ছেলেটাকে নিয়ে তার অনেক আশা-ভরসা ছিল। সে আশায় গুড়েবালি। এর চেয়ে ছেলেটা চোর-ছেচ্চর হলেও ভালো ছিল। সন্ত্রাসীদের সুখ্যাতি না থাকলেও কুখ্যাতি আছে। রঞ্জুর কোনটায় নেই। কত ডাক্তার-বৈদ্যি দেখানো হল। কিছুতেই কোন ফল হল না। যে সে-ই।
রঞ্জু অসামাজিক নয়। তার বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা অনেক বেশি না হলেও, কম নেই। বন্ধুরা যখন ঠাট্টা করে রঞ্জুকে ‘ফার্মের মুরগি’ বলে ডাকে তখন শায়লা বেগমের অন্তরদাহ হয়। রঞ্জুর মুখটা হয়ে যায় ফ্যাকাসে। তবুও দাঁত বার করে হাসার চেষ্টায় থাকে নিরন্তর। নীরবে চোখ মোছে শায়লা বেগম।
রঞ্জু ছাত্র হিসেবে খারাপ ছিল না। শৈশবে বেশি ভালো ছিল। তখন থেকে মায়ের নজরদারিতে বড় হয়েছে রঞ্জু। পিতৃহীন সন্তান হওয়ায় শায়লা বেগমের আদরের মাত্রা ছিল বেশি। তাই বলে শাসনের কমতি ছিল না। স্কুল থেকে ফিরে রঞ্জুর অন্য বন্ধুরা খেলতে যেত মাঠে। শায়লা বেগম ছেলেকে যেতে দিত না। খেলাধুলা করতে গিয়ে হাত-পা ভাঙার শংকা ছিল তার। ফুটবল খেলায় এক পক্ষের খেলোয়াড় স্বেচ্ছায় লাথি মারে অপর পক্ষকে। ’৮৬-এর বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময় ম্যারাডোনাকে কেউ লাথি মারলেই শায়লার ভেতরটা দুমরে-মুচড়ে যেত। তাই ফুটবল খেলা টিভিতেই দেখতে হয়েছে রঞ্জুকে। কখনও খেলার সুযোগ পায়নি। ক্রিকেট খেলা- সে তো আরও বিপজ্জনক। প্রায় লোহার মতো শক্ত একটা বল দিয়ে খেলে সবাই। এই বল শরীরের কোন অংশে লাগলে কী আর আস্ত থাকবে রঞ্জু? এমন সব আশংকায় ছেলেকে কখনও মাঠে খেলতে পাঠায়নি শায়লা বেগম। বিল্ডিংয়ের অনেক ছেলে আবার ছাদে খেলাধুলা করত বিকালে। কিন্তু ছাদে যাওয়া বারণ ছিল রঞ্জুর। খেলার ফাঁকে যদি ছাদ থেকে পড়ে যায় ছেলেটা। তখন কী নিয়ে বাঁচবে শায়লা। রঞ্জু তার সবেধন নীলমণি। এমনিতেই সারাদিন অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় শায়লাকে। তার ওপর ছেলেকে নিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকতে রাজি নন। বিকালে খেলাধুলা করার চেয়ে গান শেখা কিংবা আর্ট শেখাই শ্রেয়। তারপর দুজন শিক্ষক ঠিক করেছিল শায়লা। একজন গানের। অন্যজন আর্টের। এভাবেই বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা পেরিয়ে যেত রঞ্জুর। তারপর স্কুলের শিক্ষক এসে প্রাইভেট পড়াতেন। ততক্ষণে বাসায় ফিরে যেত শায়লা বেগম। রাতের পড়া শেষ করে খানিকক্ষণ টিভি দেখত রঞ্জু। সে সময়ও ছেলেকে চোখে চোখে রাখতেন শায়লা। যেন সে হিন্দি বা ইংরেজি চ্যানেল দেখতে না পারে। কার্টুন চ্যানেলও দেখা নিষেধ ছিল। কারণ অনেক সময় কার্টুন দেখা নেশা হয়ে যায় বাচ্চাদের। তখন বাচ্চারা আর কোন কাজই ঠিকমতো করে না। এসবই ছিল শায়লা বেগমের মনগড়া নীতি। তবে রঞ্জু ছেলেটা বেশ ভালো। কখনও মায়ের অবাধ্য হয়নি সে। মাকে খুশি রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা থাকত তার। তখন আহ্লাদে হৃদয় ভরে যেত শায়লার। আশপাশের মানুষজন কিংবা আত্মীয়স্বজনরা প্রায়শই রঞ্জুর সুনাম করত। গর্বে বুক ভরে যেত শায়লার। সেই বুকে আজ ধু-ধু বালুচর। কষ্টের কাঁটাতারে মোড়ানো।
শায়লার যন্ত্রণার শেষ নেই। ছেলেটা বড় হয়েছে। ঘরে ছেলের বউ আনার স্বপ্ন ছিল তার। সে স্বপ্ন কী অধরা রয়ে যাবে! রঞ্জু তো মেয়ে দেখলেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাসায় কোন মহিলা অতিথি এলে রঞ্জু রুম আটকে বসে থাকে। টিভিতে কার্টুন দেখে। সমস্যাটা কোথায় বোঝা যাচ্ছে না। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে। কোন রোগ ধরা পড়েনি। রঞ্জুর বড় খালা শায়লাকে বলে, ব্যাপারটা মানসিক সমস্যা। ছেলেকে মানসিক রোগের ডাক্তার দেখা। কিন্তু রঞ্জু মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে যেতেই অনাগ্রহী। এত বড় ছেলেকে তো আর ধরে-বেঁধে নেয়া যায় না। অগত্যা শায়লা বেগম একাই একদিন গিয়েছিল। মানসিক রোগের খ্যাতনামা ডা. কফিল উদ্দীন চৌধুরী মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনলেন। বেশ কিছু পরামর্শ দিলেন। আর শায়লাকে দোষারোপ করলেন। এ দেশের বেশির ভাগ বাবা-মাই সন্তানকে অতি ভদ্র বানাতে গিয়ে অকর্মন্য করে তোলেন। রঞ্জুর বেলায়ও তাই হয়েছে। ডাক্তারদের ভাষ্যমতে, রঞ্জুর শারীরিক কোন সমস্যা নেই। মানসিক ভারসাম্যহীনও নয় সে। সে তার ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণবন্ত। শ্রেয়াস তো রঞ্জুর জানেজিগার দোস্ত।
স্কুল থেকেই শ্রেয়াস আর রঞ্জুর বন্ধুত্ব। শ্রেয়াস বেশ ভালো ছাত্র ছিল। স্কুলে ফার্স্টবয় ছিল। রেজাল্ট বেশ ভালো। খেলাধুলায়ও ভালো ছিল সে। তাই শ্রেয়াসের সঙ্গে রঞ্জুর বন্ধুত্বে শায়লা বেগমও গর্ব বোধ করতেন। তবে শ্রেয়াস রঞ্জুর মতো নয়। শ্রেয়াস বেশ চটপটে। মিশুক স্বভাবের। ছেলেমেয়ে যে কোন কারও সঙ্গে মিশে যেতে পারে সহজে। অফিস শেষে বাসায় ফিরে শ্রেয়াসের ভালো লাগে না। এ সময়টা সে প্রিয় বন্ধু রঞ্জুর সান্নিধ্যে কাটায়। অনেক রাতে বাসায় ফেরার সময় রঞ্জুকে সঙ্গে নিয়ে যায়। এ নিয়ে শায়লা বেগমের চিন্তা নেই। বরং নিশ্চিন্ত থাকেন। শ্রেয়াসের সঙ্গে থেকে যদি ছেলেটা একটু মানুষ হয়। শায়লা লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে কয়েকবার শ্রেয়াসকেও বলেছে, তোমার বন্ধুটাকে একটু মানুষ বানাও। তোমরা বিয়ে-শাদি করে চাকরি-বাকরি করছ। অথচ রঞ্জু! কী আর বলব বাবা! আমার কপাল খারাপ। তোমরা তো বেশ ভালো বন্ধু। তুমি বোঝালে রঞ্জু বুঝতে পারে। তাকে একটা গার্লফ্রেন্ড ম্যানেজ করে দাও। মিশতে মিশতে অভ্যস্ত হতে শিখুক।
প্রতিউত্তরে শ্রেয়াস বলে, আন্টি, আমি চেষ্টা তো কম করি না। তবুও রঞ্জু পরিবর্তন হতে পারছে না। শায়লা নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একদিন তিনি তার বড় বোন শেফালীকে বললেন ডা. কফিল উদ্দীন চৌধুরীর পরামর্শের কথা। পরবর্তীতে শেফালী তার বড় মেয়ে কঙ্কার সঙ্গে ব্যাপারটা শেয়ার করল। কংকা প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইছিল না রঞ্জুর ব্যাপারটা। কারণ রঞ্জুকে দেখে কখনও অস্বাভাবিক লাগেনি কঙ্কার। এক পর্যায়ে সে মাকে খুলে বলল মনোবাসনার কথা। শেফালী শুনে খুব একটা আনন্দবোধ করেনি। আবার বাধাও দেয়নি কঙ্কাকে। শেফালীর কোন ছেলে নেই। বোনের ছেলে রঞ্জুকে তিনি নিজের ছেলের মতোই আদর করে ছোটবেলা থেকে।
আদর করার কারণও আছে। বিয়ের প্রায় বারো বছর পর শেফালীর পেটে এসেছিল কঙ্কা। প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়ায় তিনি বেশ খুশি ছিলেন। মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলেন, বড় হলে কঙ্কাকে বিয়ে দেবেন রঞ্জুর সঙ্গে। বড় হতে হতে রঞ্জু দিনকে দিন কেমন জানি হয়ে যাচ্ছিল। এখনও চাকরি-বাকরি করতে পারে না। মায়ের ঘাড়ে বসে বসে খায়। তার ওপর শায়লার কাছ থেকে রঞ্জুর বর্তমান সমস্যার কথা জানতে পেরে আরও হতাশ হয়েছেন শেফালী। তখন কঙ্কার মনোবাসনার কথা জেনে শেফালী কী সিদ্ধান্ত দেবে বুঝে উঠতে পারছেন না। তবে তিনি মেয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চান না।
পরদিন ভার্সিটিতে কঙ্কার ক্লাস শেষ হয়েছিল দুপুরের দিকে। হুট করে সে সিদ্ধান্ত নিল, রঞ্জুদের বাসায় যাবে। ভাবনা অনুযায়ী কাজ। যাওয়ার পথে একবার ভেবেছিল, শায়লা খালাকে ফোন দেবে। পরে আর দিল না। কঙ্কা যে আজকে একটা মিশন নিয়ে খালার বাসায় যাচ্ছে তা সে বাসার কেউ জানে না। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে গেল কঙ্কা। কলিং বেল দিতেই রঞ্জু এসে দরজা খুলল। কঙ্কাকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হল। কঙ্কার ঠোঁটে চাঁদের হাসি। রঞ্জু কী করবে আর কী বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না। মিষ্টি হেসে কঙ্কা বলল, ভেতরে আসতে দেবেন না?
ও… আসো, আসো। ভেতরে আসো। বলে দরজা ছেড়ে দাঁড়ায় রঞ্জু। বাসায় মা নেই। অথচ কঙ্কা এলো। কেন এলো? বাসা খালি। ইত্যাদি হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে রঞ্জু দরজা লাগাল। ভেতরে এসে সে দেখতে পেল, কঙ্কা সটান হয়ে শুয়ে সোফায়। ওড়নাটা বুকে নেই। গলার দিকে বাঁকা হয়ে আছে সাপের মতো। এর আগে কোন মেয়েকে এভাবে কখনও দেখেনি রঞ্জু। তাই তার বুকের মধ্যেখানে কেমন যেন মোচড় মারল। একি এক অস্বস্তিতে পড়ল রঞ্জু! বাসায় মা থাকলে না হয় নিজের রুমে আটকিয়ে থাকতে পারত। এখন তাও পারছে না। এটা করতে গেলে যে অভদ্রতা দেখায়, এতটুকু অন্তত বোঝে রঞ্জু। সে লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। তবুও আড় চোখের দৃষ্টি চলে যাচ্ছিল কঙ্কার ওড়নায়। প্রথম দেখা বলে কথা। হুট করে কঙ্কা বলল, ক্ষুধা লেগেছে রঞ্জু ভাই।
কঙ্কার দিকে না তাকিয়েই রঞ্জু বলল, বুয়া রান্না করে গেছে। খেয়ে নাও। আমি খেয়ে নিয়েছি।
না আমার অন্য কিছু খেতে ইচ্ছে করছে। কঙ্কা যতই কথা বাড়াচ্ছে ততই অস্বস্তি বাড়ছে রঞ্জুর। ভাগ্যিস? হাতের কাছে একটা পত্রিকা পাওয়া গেছে। পত্রিকা কোন রকমে হাতে তুলে চোখ বুলাতে লাগল। পত্রিকাটা আজকের, নাকি পুরনো? তা জানে না রঞ্জু। তবুও কঙ্কার কথার প্রতিউত্তরে বলল, কী খেতে চাইছ? আমি এনে দেব?
না না। আপনার আনতে হবে না। আমিই রান্না করছি। বলে উঠে গেল কঙ্কা। ভেতরের দিকে গেল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল রঞ্জু। মনে মনে দোয়া করছে, মা যেন দ্রুত অফিস থেকে ফিরে। অন্তত আজকের দিনটায়। ভেতরে ভেতরে এমনটা প্রার্থনা করছে। আর চোখ পড়ে আছে টিভিতে। ক্যাটরিনা, বিপাশা, দিপীকা কিংবা সোনাক্ষী এখন রঞ্জুর নজরবন্দি। ওদের উদ্দাম নৃত্য অবাক করছে রঞ্জুকে।
একটু পর কঙ্কা এলো রঞ্জুর শাসনে। ওড়নাটা এখন গলায়ও নেই। একি! মতিভ্রম হচ্ছে না তো রঞ্জুর। প্রিয়াংকা, লারা দত্ত, কখনও কখনও জ্যাকলিন ফার্নান্দেজের চেহারা ভেসে উঠছে কঙ্কার মুখায়বে। হঠাৎ হেঁচকা টানে সম্বিত ফিরে পায় রঞ্জু। কঙ্কা হাত ধরে টানতে টানতে রঞ্জুকে নিয়ে যায় ভেতরে। এই প্রথম হিন্দি সিনেমার মতো কোন মেয়ে তাকে স্পর্শ করল। অনুভূতিটা ভিন্ন। বৈচিত্র্যময়। কিন্তু চিত্তাকর্ষণ করছে না রঞ্জুকে। রঞ্জু এখন নার্ভাস। সম্যক জ্ঞান হারানো। এখনও সে ডুবে আছে প্রথম স্পর্শের অনুভূতিতে। হৃদয়টা বিপর্যস্ত। এখন কি হবে? আরও বেশি কিছু? অসহায় রঞ্জু। তাকে টানতে টানতে রান্না ঘরে নিয়ে গেল কঙ্কা। বলল, আপনি এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন।
রঞ্জু তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে চুপচাপ। কঙ্কা বলল, আপনাকে আমি রান্না শেখাব। আমি এখন বিরিয়ানি রান্না করব। বিরিয়ানি ঠিক না। কারণ ফ্রিজে খাসির মাংস পেলাম না। মুরগির মাংস পেয়েছি। তাই দিয়ে রান্না করব। এটাকে বলে মোরগ পোলাও। আমি আপনাকে রান্নাটা শিখিয়ে দিচ্ছি। বিয়ের পর বউকে করে খাওয়াতে পারবেন। রঞ্জু তালগাছের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নড়াচড়া নেই। মনে মনে ভাবছে, মা কেন এখনও আসে না। হায়রে বিপদ! ড্রয়িংরুমে টিভিতে চলছে হিন্দি সিনেমার গান। মা এসে যদি দেখতে পায় তবে আস্ত থাকবে না রঞ্জু। কিন্তু কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। ও… গড! থ্যাকস। কঙ্কা তাকে রান্নাঘরে নিয়ে এসেছে। বেডরুমে নিয়ে গেলে যে কী অবস্থা হতো! আপাতত সে চিন্তা বাদ। কঙ্কা বকরবকর করেই যাচ্ছে। কী পরিমাণ পেঁয়াজ, আদা কতটুকু, কী পরিমাণ চাল, সঙ্গে মাংস। কতক্ষণ ভাজতে হবে। তারপর কী পরিমাণ পানি দিতে হবে- এসব নানা ফিরিস্তি দিয়ে যাচ্ছে কঙ্কা। আর রঞ্জু মনে মনে মুক্তির উপায় খুঁজছে। মাঝে মাঝে সৃষ্টিকর্তাও বড়ই নিরাশ করে। কোন কথা শুনে না। বুঝেও বুঝে না কিছুই। বান্দার হাঁকডাক কানে যায় না তার। ভাবনার পাঁচালীতে আটকে যায় রঞ্জু।
একটু পর কঙ্কা বলল, খেতে চলেন টেবিলে। রঞ্জু ভয়ে ভয়ে উচ্চারণ করল, আমি তো খেয়ে নিয়েছি। কঙ্কা চোখ বড় বড় করে বলল, কোন কথা শুনতে চাই না। এখন আমি যা বলছি শুনুন। নইলে বিপদ হবে। বলেই হেসে ফেলে কঙ্কা। তবুও আতংক কাটে না রঞ্জুর।
ডাইনিং টেবিলে বসে খাচ্ছে কঙ্কা। রঞ্জুর পাতেও দেয়া হয়েছে মোরগ পোলাও। সুঘ্রাণে মৌ মৌ। রঞ্জু অস্বস্তির কারণে খেতে পারছে না। নাড়াচাড়া করছে শুধু। আর আনমনে কী যেন ভাবছে। এমন সময় একটা ধমকের স্বর কানে লাগে তার। তাকিয়ে দেখে, কঙ্কা চোখ লাল করে চেয়ে রয়েছে। অমনি মাথা নামিয়ে রঞ্জু ভালো ছেলের মতো কয়েক লোকমা মুখ পুরে দিল। আবারও কঙ্কার ধমকের স্বর, এভাবে খাচ্ছেন কেন? গলায় আটকাবে তো। এ কথা শুনে স্বাভাবিকভাবে খাওয়ার চেষ্টা করে রঞ্জু। একটু পর কলিংবেল বাজে। রঞ্জুর মনে স্বস্তি আসে। মা এসেছে বোধহয়। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই কঙ্কা ধমক- আপনি কোথায় যাচ্ছেন? বসেন। চুপচাপ খান। আমি দেখছি। বলে কঙ্কা উঠে গেল। এ সময় রঞ্জুর ইচ্ছে করছিল খাবারের প্লেটটা আছাড় মারতে। কিন্তু মারল না। হাজার হোক সুস্বাদু খাবার। কত দিন খায় না।
দরজা খোলার পর কঙ্কাকে দেখে শায়লাও একটু অবাক হয়। কীরে তুই?
মন চাইল, চলে এলাম।
ভালো করেছিস, তোকে এমন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন? রঞ্জু কোথায়? রঞ্জু হাঁক ছাড়ে, মা আমি খাচ্ছি।
শায়লা বলল, তোরা এখন খাচ্ছিস কেন? বলতে বলতে ডাইনিং স্পেসে চলে এলো। শায়লার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কঙ্কা বলল, বুয়ার রান্না খেতে ইচ্ছে করছিল না। তাই আমি নিজে রান্না করলাম। রঞ্জু ভাইকেও জোর করে খাওয়াচ্ছি।
ওমা! জোর করে কেন? প্রশ্ন করলেন শায়লা। প্রতিউত্তরে রঞ্জু বলল, না না মা, ভালোই লাগছে খেতে।
আজকেও শ্রেয়াস তার বাসায় নিয়ে গেছে রঞ্জুকে। শ্রেয়াসকে কাছে পেলে রঞ্জু যতটা খুশি হয় ততটা খুশি সে আর কিছুতে হয় না। রঞ্জু আজকে ভেবেই রেখেছিল, কঙ্কার ব্যাপারটা শেয়ার করবে। কিন্তু সুযোগ হচ্ছিল না। একটা সময় পর রঞ্জু ব্যাপারটা খুলে বলল শ্রেয়াসকে। শুনেই শ্রেয়াস অনেক উচ্ছ্বসিত। এতে মন খারাপ করল রঞ্জু। শ্রেয়াস বলল, এত ভালো খবর। আন্টি, মানে তোর মা অনেক দিন ধরে আমার কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করছিল।
কি বলছিল মা তোকে? প্রশ্ন করল রঞ্জু। না, মানে, আন্টি বলছিল তোর জন্য একটা গার্লফ্রেন্ড জোগাড় করে দিতে। বাহ। পেয়ে গেলি তো। ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছে।
তাতে তুই অনেক খুশি হয়েছিস মনে হয়? পাল্টা পশ্ন ছুড়ল রঞ্জু।
খুশি না হওয়ার কী আছে। শোন, আমরা প্রত্যেকে সামাজিক জীব। সমাজ মেনেই তো চলতে হবে। বিয়ের বয়সেও যদি তুই বিয়ে না করিস, তবে তোকে কেউ ভালো চেখে দেখবে না। অসুস্থ ভাববে।
ভাবলে ভাববে। তাতে কার কি? অনেকটা ক্ষোভ নিয়েই কথাটা বলল রঞ্জু।
শ্রেয়াস এবার রঞ্জুকে ভালোমতো বোঝানোর চেষ্টা করল। শোন, তুই চাকরি-বাকরি কিছুই করিস না। এভাবে আর কত দিন? আল্লাহ না করুক যদি তোর মায়ের কিছু হয়ে যায়! তখন কী হবে তোর। একবার ভেবে দেখেছিস, তোর বাবা মারা যাওয়ার পর চাচা-ফুফুরা কোন সম্পর্ক রাখেনি তোদের সঙ্গে। আন্টি এত বছর ধরে চাকরি করে কোন রকমে একটা ফ্ল্যাট কিনেছেন। অফিসের গাড়ি ব্যবহার করেন। তার ব্যাংক ব্যালেন্স কত তা আমি জানি না। তবে বুঝি। তুই আজীবন বসে খাওয়ার মতো টাকা তোর মায়ের অ্যাকাউন্ট নেই। আমি চাকরিজীবী। আমি বুঝি না? তোর যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তোর এখন এসব নিয়ে ভাবা উচিত। মাথার ওপর একটা ছায়া দরকার। এ জন্য বিয়ে করাটা জরুরি।
রঞ্জু তখন মহাক্ষিপ্ত হয়ে বলে, এতকিছু যদি করতে হয় তাহলে তুই আছিস কেন? তুই না আমার ভালো বন্ধু! তুই না আমার জন্য সব পারিস। তাহলে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে তোর এত শংকা কেন? তুই কি আমার ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারিস না?
শ্রেয়াস তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে, আমি বন্ধু হিসেবে আজীবন তোর পাশে থাকব। কিন্তু আমারও বউ আছে। সামনে আমার বংশদর আসবে। আমি ওদেরকে নিয়েই বেশি বেশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করব। এটাই স্বাভাবিক। আমরা ব্যক্তিগতভাবে যা কিছু করে বেড়াই না কেন সবকিছুর ওপরে আমরা সামাজিক জীব। সমাজের বাইরে আমরা যেতে পারি না।
কথায় কথায় বেশ কথাকাটাকাটি লেগে গেল রঞ্জু ও শ্রেয়াসের। এক পর্যায়ে রঞ্জু রাগ করে বেরিয় এলো শ্রেয়াসের বাসা থেকে। শ্রেয়াসও তাকে আটকালো না। কারণ রঞ্জুর সামাজিক হওয়া প্রয়োজন। এ উপলব্ধি তার হোক।
রাগ করে রঞ্জু চলে এলো শ্রেয়াসের বাসা থেকে। এরপর কেউ কাউকে আর ফোন দেয়নি। দুজনের বুকটা ফেটে যাচ্ছে ঠিকই। মুখ ফুটে প্রকাশ করছে না কেউ। এদিকে শ্রেয়াস অফিস নিয়ে ব্যস্ত। অফিস থেকে শ্বশুরবাড়ি যায়। সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে সময় দেয়। এর ভেতর রঞ্জুর কথা যে তার মনে পড়ে না, তা নয়। কিন্তু শ্রেয়াসেরও অভিমান হয়েছে। এই প্রথম রঞ্জু তার কোন কথা শুনল না। বুঝতেও চাইল না। রঞ্জু এমন রূঢ় হতে পারে, ভাবেনি শ্রেয়াস। সে বরং ভাবত, রঞ্জু তার সব কথা শুনে। মতামতকে গুরুত্ব দেয়।
গত দু’দিন ধরে শায়লা বেগম লক্ষ্য করছে তার ছেলেটা বেশ অস্থির হয়ে আছে। কেন এই অস্থিরতা তা আবিষ্কার করতে পারেনি। এতদিনে শায়লা তার বড় আপার কাছে জেনে গেছে কঙ্কার মিশন সম্পর্কে। মনে মনে তাই বিধাতাকে ধন্যবাদ জানায় শায়লা। সে কঙ্কাকে ফোন করে। নাহ, কঙ্কার সঙ্গে তেমন কোন ঘটনা ঘটার সুযোগ নেই। তাহলে? কেন রঞ্জু এমন হয়ে গেছে।
রাতভর রঞ্জু ঘুমায়নি।
এভাবে দুই মাস পেরিয়ে গেল। রঞ্জু ও শ্রেয়াসের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। রঞ্জু এখন লোক দেখানো মাতামাতিতে আছে কঙ্কাকে নিয়ে। যেখানে যায় কঙ্কাকে সঙ্গী করে নিচ্ছে রঞ্জু। এতে রঞ্জুর স্কুলফ্রেন্ডরাও অবাক হচ্ছে। এ কোন আলাদিনের চেরাগের ঘষায় পরিবর্তন এসেছে রঞ্জুর! সরলা কঙ্কা এসবের কিছুই বোঝে না। সে আছে সরল অংক নিয়ে। এখন রঞ্জু দেদারসে কঙ্কার হাত ধরে চলে। প্রকাশ্যে চুমু-টুমুও খায়। তবে সেটা আড়ালে নয়। কঙ্কা এখন শতভাগ শিওর, রঞ্জু আর আগের মতো নেই। রঞ্জু সামাজিক জীবনে ফিরে এসেছে। একদিন রিকশায় ঘুরতে গিয়ে কঙ্কা হাতে হাত জড়িয়ে নেয় রঞ্জুর। বিপত্তিটা ঘটে সেখানেই। অনাকাক্সিক্ষত বিপত্তি। রঞ্জুর হাতের ব্লেটের দাগ শুকায়নি। স্পষ্ট অক্ষরে এস দেখা যাচ্ছে। এ নিয়ে কঙ্কার সঙ্গে তুমুল মনোমালিন্য হয় রঞ্জুর। রঞ্জু যতই বোঝানোর চেষ্টা করুক যে, সে শ্রেয়াসের নামের আদ্যাক্ষর লিখেছে। কিছুতেই বিশ্বাস করছে না কঙ্কা। সে কেন্দে-কেটে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে ফেলেছে। অগত্যা রঞ্জু তাকে নিয়ে শ্রেয়াসের বাসার গেটে যায়। দারোয়ানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তবুও শ্রেয়াসকে ফোন দেয় না। কঙ্কা বিশ্বাস করে। ফিরে আসে। সঙ্গে যায় না কঙ্কার। কোন ছেলে বন্ধুর জন্য হাত কাটতে পারে! অবিশ্বাস্য কঙ্কা বিষয়টা গুরুতর পর্যায়ে আমলে নেয়।
আরও দুই-তিন দিন পর শ্রেয়াস হঠাৎ ফোন করল রঞ্জুকে। সে শ্রেয়াসের ফোন পেয়ে আবেগে উদ্বেলিত। ভুলেই গেছে সবকিছু। সন্ধ্যায় বাসায় ডাকল শ্রেয়াস। অথচ এ সন্ধ্যায় কঙ্কার সঙ্গে নাটক দেখতে যাওয়ার কথা জাতীয় নাট্যশালায়। কঙ্কা রেডি। অথচ রঞ্জুর ফোন বন্ধ। কঙ্কা আর না পারতে রঞ্জুদের বাসায় এলো। শায়লা খালা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করল তাকে। খালাকে কিছুই বলল না কঙ্কা। রঞ্জু বাসা থেকে বের হয়েছে অনেক আগেই- জেনে কঙ্কা কোন রকমে স্থান ত্যাগ করে। এখান থেকে বের হয়েই সে রিকশা নেয়। কঙ্কার কেন জানি সন্দেহ হয়। সে রিকশা ঘুড়িয়ে শ্রেয়াসের বাসার দিকে যায়। শ্রেয়াসের বাসার গেটে পৌঁছাল। দারোয়ান জিজ্ঞেস করল, কই যাবেন? উত্তরে কঙ্কা বলল, শ্রেয়াস ভাইয়ের বাসায় যাব। দারোয়ানের মনে পড়ে যায়। সে হঠাৎ করে বলে, আপনি শ্রেয়াস ভাইয়ের বন্ধু রঞ্জু ভাইয়ের সঙ্গে একদিন এসেছিলেন না? কঙ্কা এ কথায় একটু অবাক হয়। দারোয়ানের মেমোরি এত শার্প! এতকিছু ভাবার সময় এখন নয়। তাই বলল, হুম। দারোয়ান বলল, যান। লিফটের ফোর। কোন কথা না বলে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল কঙ্কা। লিফটে উঠল। বাটন ফোর চাপল। দ্বিধায় পড়ল, শ্রেয়াসের বাসা কোনটা? হঠাৎ তার মনে পড়ল, সেদিন রঞ্জু বলেছিল শ্রেয়াসের ফ্ল্যাট নাম্বার ফোর বি। আÍবিশ্বাস নিয়ে ফোর বির দরজায় চাপ দিল কঙ্কা। কী অদ্ভুত! দরজা খোলা! শংকায় আছে কঙ্কা। ঠিক জায়গায় এসেছি তো। তবুও সাহস করে সে ঢুকে গেল ভেতরে। ঢুকেই দেখে ড্রয়িংরুম ফাঁকা দু’পা বাড়িয়ে ডাইনিং স্পেসে গেল। কেউ নেই। সোজা একটু এগুলে হাতের দু’পাশে দুটো বেডরুম। প্রথমে ডান পাশেরটা খুলল কঙ্কা। তাও অনেক ভয়ে ভয়ে। কার না কার বাসায় ঢুকে পড়েছে সে। নিজেও ঠিক জানে না। নাহ, শান্তি। ডান পাশের রুমটায় কেউ নেই। তারপর একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালো কঙ্কা। বুকে সাহস নিয়ে বাঁ পাশে তাকালো। বাঁ পাশে আরেকটা বেডরুম। কঙ্কা চেষ্টা করল যতটা নিঃশব্দে খোলা যায় এ রুমের দরজা। হাতল ঘোড়াতেই খুলে যায়। এরপরের দৃশ্যটা অবিশ্বাস্য। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না কঙ্কা। একটা চাদর পড়ে আছে তাদের পায়ের কাছে। ওরা উলঙ্গ। রঞ্জু-শ্রেয়াস আদিরসের মূর্ছনায় নিবেদিত।

-পুনঃপ্রকাশ

বাংলাদেশনিউজ২৪x৭.কম
২৪.০৭.২০১৩


Comments are closed.